A BILINGUAL ONLINE LITERARY MAGAZINE

পুনহিলে ভোরের আলোর খোঁজে

উল্লেরি থেকে ঘোড়েপানি রুটটি নেপালের অন্নপূর্ণা অঞ্চলের পুন হিল (Poon Hill) ট্রেকিং ট্রেইলের অন্তর্ভুক্তউল্লেরির উচ্চতা ২,০৫০ মিটারউল্লেরি থেকে ঘোড়েপানির দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার এবং হেঁটে যেতে সাধারণতথেকেঘণ্টা সময় লাগে। এই পথটি পাথর বাঁধানো সিঁড়িসুন্দর বনের মধ্য দিয়ে ওপরে উঠেছে


এমনিতেই আমি সকালে ঘুম থেকে উঠতে পছন্দ করি। ট্রেকে এসে তো ঘুম যেন আরও অচেনা হয়ে যায়—স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মধ্যরাতেই আমাকে ফেলে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এর আগে কখনো এর ব্যত্যয় ঘটেনি, আজও ঘটবে এমনটা আশা করা বোকামি। তবে এ ঘুম-ফুরোনো ভোর আমাকে ফেলে দেয় ভীষণ এক টানাপোড়েনে।


বাইরে বের হলে ঠাণ্ডা চিতার ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়বে, অথচ বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেও আর কাহাতক সময় নষ্ট করা যায়! অবশেষে সূর্য ওঠার আগেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি। তিনতলার টেরেসে এসে দাঁড়াতেই হিমশীতল বাতাস হামলে পড়লো, মনে হলো সে যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। ফিনফিনে ধারাল হাওয়া হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।


পূর্ব আকাশে চোখ মেলে সূর্যের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি। ভাবছি নয়টা-পাঁচটার যান্ত্রিক জীবনে কি অপূর্ণতা রয়েছে? যা আমাকে উৎসাহিত করলো কোলাহলময় শহর থেকে পালিয়ে আসতে? নাকি পরিব্রাজকের মনই আমাকে এনে দাঁড় করিয়েছে, দুর্গম এই পাহাড়-উপত্যকায়? কেন বারবার পাহাড়ে আসি—তার কোনো যৌক্তিক কারণ এখনো খুঁজে পাইনি। তবু এসেই দাঁড়াই। উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই বারবার ফিরে আসি। যদি কোনোদিন সত্যিই উত্তর পেয়ে যাই, তাহলে কি আসা বন্ধ হয়ে যাবে?

এইসব উদ্ভট ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ঠিক তখনই এক চিলতে আলো মেঘের পর্দা সরিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় এসে পড়ল। মুহূর্তে আগুনরঙা আভা ছড়িয়ে মেঘের আড়ালে কোথায় যেন হারিয়ে গেল, আর খুঁজে পাওয়া গেল না। দৃষ্টি বাঁধাহীনভাবে গিরিখাত পেরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়, শেষে থেমে যায় আরেকটি দূর পাহাড়ের গায়ে। সেখানে মেঘের দৌড়ঝাঁপে সূর্যের উপস্থিতি সরাসরি দেখা যায় না, তবু সে অদৃশ্য থেকেও আলোকিত করে রাখে চারপাশ।


রুমে ফিরে তৈরি হতে শুরু করলাম। ট্রেক যত সকালে শুরু করা যায় ততোই ভালো। সাধারণত এগারোটার পর থেকেই আবহাওয়ার বদল শুরু হয়—বাতাস জোরে বয়ে আসে, পথে বরফ নরম হয়ে যায়, রোদও প্রখর হতে শুরু করে। তাই আবহাওয়া বিগড়ানোর আগে যতটা সম্ভব এগিয়ে যাওয়াই মঙ্গল।


ফ্রেশ হয়ে নীচে নেমে এলাম নাস্তা করতে। ব্যাগ রুমে গুছিয়ে রেখে এসেছি। শিশিরকে জানিয়ে দিলাম, চাইলে সে ব্যাগ বাঁধতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন লজে ওঠার কারণে আমাদের দলের অন্য সদস্য তমাল ও সুতপার সঙ্গে নাস্তার টেবিলে দেখা হচ্ছে না।


সবাই একে একে বেরিয়ে গেলেও আমরা তখনো রওনা হতে পারিনি। তমাল আর সুতপা তৈরি হতে দেরি করছে। শেষ পর্যন্ত ট্রেক শুরু করতে গিয়ে বাজল আটটা চল্লিশ, কমপক্ষে এক ঘণ্টা পিছিয়ে পড়লাম।হিমালয়ের সূর্য বড় বেয়াড়া, প্রতিনিয়ত ঠাণ্ডার ঘাড়ে চেপে বসতে চায়। সবসময় পেরে না উঠলেও, যদি উঠতে পারে তখন তার দাপট ভয়ানক।


আজকের গন্তব্য ঘোড়েপানি। উল্লেরি থেকে ৮ কিলোমিটার পথ, উচ্চতা ২,৮৭৪ মিটার।শুরুর হাঁটাটা একসঙ্গে হলেও দলছুট হতে বেশি সময় লাগল না। ছবি তোলার নেশায় তমাল আর সুতপা বারবার পিছিয়ে পড়ে, আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। বাধ্য হয়ে নেত্রাকে ওদের সঙ্গে থাকতে হয়। আমাদের পোর্টার শিশির আর নমরাজ, প্রতিদিনের মতো আমাদের পরে শুরু করেও সামনে চলে গেল, যা তাদের স্বভাবসিদ্ধ। ফলে আমার আর কানিজের একসঙ্গে পথ চলা।


পথ এমনভাবে চিহ্নিত যে হারিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দ্বিধায় পড়লাম,নির্মাণাধীন গাড়ির রাস্তা সোজা উঠে গেছে, আরেকটা পথ জঙ্গলের দিকে নেমে গেছে নিচে। দৃশ্যমান কোনো নির্দেশক নেই। আমাদের বিপাকে দেখে একজন বিশ্রামরত পোর্টার সঠিক পথ দেখিয়ে দিল। পরে এগোতেই চোখে পড়ল, পাথরে আঁকা তীরচিহ্নই আসল দিকনির্দেশক, অথচ আমাদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।


শুরু হলো বনপথ। রডোডেনড্রন, পাইন আর বার্চের ঘন ছায়া। সূর্যের আলো প্রবেশ করতে গোপন ফাঁকফোঁকর খুঁজে নেয়, আলো কমলেই ঠাণ্ডার দাপট বেড়ে যায়। পথ ক্রমশ ঢালু হয়ে নিচে নামছে। কোথাও কোথাও পাথরের গায়ে আছড়ে পড়তে পড়তে পানির শব্দ কানে বাজছে। বোঝাই গেল—একটা ঝিরি পার হতে হবে, তারপর আবার সামনে উঠতে হবে পাহাড়ের বুক বেয়ে।


নদী পার হয়ে উপরে উঠতেই চোখে পড়ল এক ছোট্ট বিশ্রামস্থান, চায়ের দোকান। ডানদিকে সরু স্রোতে গুনগুন করে বয়ে চলেছে পানি। শিশির আর নমরাজ চায়ের কাপ হাতে পা ছড়িয়ে বসে আছে। কানিজ চা খেতে রাজি হলো না, তাই আমরা এগিয়ে গেলাম।


অল্পক্ষণেই আকাশের মুখ বদলে গেল। হয়তো অনেকক্ষণ ধরেই তার ভিতরে জমছিল কালো রাগ, কেবল ঘন বনের আড়ালে আমাদের চোখে ধরা দেয়নি। হঠাৎ দু-এক ফোঁটা গায়ে লাগতেই আসন্ন বিপদ বুঝে গেলাম। আমাদের সঙ্গে মাত্র একটি পঞ্চো। মোট তিনটে পঞ্চোর মধ্যে এই একটাই খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তৌফিক আগের দিন তার পঞ্চো দিতে চেয়েছিল, আলসেমি করে নেইনি। মনে পড়ে গেল—অন্য এক সহকর্মী এই মুহূর্তে ট্রেক করছে, তার পোস্টে দেখেছিলাম বৃষ্টি হচ্ছে। তবু আমি কেন যেন হেলাফেলা করেছিলাম, এখন আর উত্তর মেলে না।


কানিজকে তাড়াতাড়ি হাঁটতে বললাম। আকাশ যেন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়তে চাইছে। সামনে এক টি-হাউস দেখা যেতেই মনে সাহস এলো। শিশির আমাদের পেরিয়ে এগিয়ে গেল, কিন্তু ওদের কাছে আমাদের মূল ব্যাগ ভিজে গেলে সর্বনাশ। যাই হোক, ঝড় নামার আগে দৌড়ে কোনো মতে পৌঁছে গেলাম টি-হাউসে।


ভেতরে ঢুকেই দেখি, আমাদের আগে বহু ট্রেকার চেয়ার দখল করে বসে আছে। হয়তো দুপুরের খাবারের জন্য থেমেছিল, কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টির কারণে আটকে পড়েছে। আমরা খানিকটা ভিজে গেছি। ডাইনিং হলের ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে, যদিও সেখানে বসার জায়গা নেই। আমাদের জবথবু অবস্থা দেখে, এক জার্মান দম্পতি তাদের আসন ছেড়ে দিল। দুটি গরম চকলেট অর্ডার করে আমরা পাশে গিয়ে বসলাম। বাইরে বৃষ্টি তার সর্বশক্তি নিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে, আর আমরা আগুন আর চকলেটের উষ্ণতায় ভিজে যাচ্ছি অন্যরকম এক শান্তিতে।


আমরা বসে আছি ডাইনিং হলে। তার ঠিক উল্টো দিকে শোবার ঘরগুলো। মাঝখানে উঠোনের মতো ফাঁকা জায়গায় টেবিল পাতা আছে, বড় বড় ছাতা দিয়ে রোদ-বৃষ্টি ঠেকানোর ব্যবস্থা করা। শুরুতে কয়েকজন সেখানেই বসেছিল, কিন্তু বৃষ্টির তোড় ও ঝোড়ো হাওয়ার দমকে শেষ পর্যন্ত কেউ টিকতে পারেনি।


ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা এমন তীব্র যে মনে হচ্ছিল বুক কেঁপে থেমে যাবে। বাইরে দাপুটে বৃষ্টির শব্দ, ভেতরে ফায়ারপ্লেসের আগুনের কটকট—এই দুই সুরে মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভীতিপূর্ণ সঙ্গীত বাজছে।

কিন্তু তমালদের কোনো খোঁজ নেই। বৃষ্টিতে কোথায় যে আটকে পড়েছে কে জানে! মনে হচ্ছিল, যদি ভিজে ঠাণ্ডায় কাবু হয়ে পড়ে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তার উপর ওর ব্যাগে আছে দু-তিনটা ক্যামেরা আর বেশ কয়েকটা লেন্স—ভিজে গেলে সব শেষ। তবে খানিকটা সান্ত্বনা এটাই যে, নেত্রা ওদের সঙ্গে আছে। ও নিশ্চয় কোনো না কোনো উপায় বের করে ফেলবে।


বৃষ্টি কিছুটা থামতেই বাইরে এসে দাঁড়ালাম। টি-হাউসটি পাহাড়ের একেবারে ঢালে। কাঠের পাটাতনের উপর খাওয়ার ব্যবস্থা। সেখান থেকে তাকাতেই গোটা উপত্যকা চোখের সামনে ধরা দিলো। কুহেলিকার চাদরে মোড়া সবুজ পাহাড়, বৃষ্টিস্নাত রডোডেনড্রনের সারি, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর কোনো চেনা জায়গা নয়, যেন অচেনা কোনো স্বপ্নপুরী।


গাইডরা একজোট হয়ে হৈচৈ করে ছবি তুলছিল, আমার ছবিও তুলে দিলো। কানিজকে ডাকলাম, ওকেও ফ্রেমে ধরে রাখলাম। কিন্তু পাহাড়ি মেঘের ধৈর্য কম। আবারও গর্জন তুলে ছুটে এল, দাপিয়ে ঢেকে দিলো দিগন্ত। আমরা দৌড়ে আবার আশ্রয় নিলাম ডাইনিং হলে।


অল্প সময়ের মধ্যেই তমাল আর সুতপা এসে হাজির। ওরা নিচের দিকে দোকানে ছিল, আর বৃষ্টি যেন ওদের অপেক্ষায় ছিল। পৌঁছাতেই সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে আবার ঝাঁপিয়ে পড়লো নেমেই। যারা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষায় বসেছিল, তারা বুঝে গেলো এ বৃষ্টি থামার নয়। যার কাছে যা ছিল, তাই মাথায় চাপাল; যাদের ছিল না, তারা মাথায় পলিথিন চাপিয়ে পথে নেমে পড়লো। আমিও একটা পলিথিন কিনে রাখলাম।


ঠিক তখনই ঢুকলো ভিজে-চুপচুপে এক জার্মান দম্পতি। ওদের দুটি ব্যাগ—একটা ডিউটার কভার দিয়ে ঢাকা, অন্যটা ব্ল্যাক ডায়মন্ড। আশ্চর্যের ব্যাপার, ব্ল্যাক ডায়মন্ডের ভেতরকার জিনিসপত্র সব ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে, অথচ ডিউটার একদম শুকনো। লোকটা হতাশ গলায় বললো—“ভেবেছিলাম ডিউটার হলেও হতে অ্যারে ব্ল্যাক ডায়মন্ড ব্যর্থ হবে না, অথচ হলো উল্টোটা।” আমি মুচকি হেসে বললাম—“তোমাদের দেশের ব্র্যান্ড তো তাই তোমাকে নিরাশ করেনি।” সে-ও হেসে মাথা নাড়লো। আমারও ভরসা বাড়লো, কারণ আমাদের দুটো ব্যাগই ডিউটার।


শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো—বৃষ্টি উপেক্ষা করেই নামতে হবে। যত দেরি হচ্ছে, ততই ঝুঁকি বাড়ছে। লাঞ্চের ঝাম্লে চুকিয়ে ব্যাগ কাঁধে তুললাম। কানিজকে দিয়ে দিলাম আমাদের একমাত্র পঞ্চ। বাকিরা পলিথিন দিয়ে কোনো রকমে সমাধান করলো। যদিও উইন্ডচিটার পরে কিছুটা বাঁচা যেত, কিন্তু পিঠের ব্যাগ ভিজে গেলে সর্বনাশ—তাই ঝুঁকি নিলাম না। পঞ্চ পরে হাঁটা যতই বিরক্তিকর হোক, এটিই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।


পঞ্চ গায়ে হেঁটে ঘেমে নেয়ে একাকার। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। অবশেষে যখন আমরা ঘোড়েপানি গেটের কাছে পৌঁছালাম, তখন ঘড়িতে বিকেল চারটা।কিন্ত একদম অন্ধকার হয়ে আছে, মনে হয় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। গেটের ডানদিকে চেকপোস্টে পুলিশ কাগজপত্র চাইলো, নেত্রা পিছনে তমালদের সঙ্গে এবং ওর কাছেই সব কাগজ। গাইড পিছনে আসছে বলে ছুটকারা নিলাম।


নেত্রা আগেই বলে দিয়েছিল, আজকের লজের নাম ফিস টেইল। জিজ্ঞেস করতেই লোকজন সোজা উপরের দিকে পথ দেখিয়ে দিল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো লম্বা সিঁড়ি, আর আমাদের মন সঙ্গে সঙ্গে নিস্তেজ। ভেবেছিলাম—“পৌঁছে গেছি”—কিন্তু আসলেই তখনো অনেকটা পথ বাকি! এখানে আমরা আছি লোয়ার ঘোড়েপানি, যেতে হবে আপারে। যদিও দূরত্ব খুব বেশি নয়, তবু এই সিঁড়ি দেখে কানিজের মেজাজ বিগড়ে গেল। ঢাকায় থেকেও ও সিঁড়ি বাইতে চায় না, পাহাড়ি সিঁড়ি দেখলে তো কথাই নেই! পথের বাঁদিকে তখন টাডাপানি যাওয়ার সাইনবোর্ড দেখা গেল। কানিজের প্রশ্ন—“যদি এই দিক দিয়েই যেতে হয়, তবে লজটা উপরে কেন?”—রাগটা আসলে সিঁড়ির জন্যই।


অবশেষে উপরে উঠে লজে পৌঁছালাম। নিচতলায় ঢুকতেই একজন এগিয়ে এসে সিঁড়ি দেখিয়ে দিল উপরে ওঠার জন্য, আর জানাল—আমাদের পঞ্চ ও ভেজা কাপড় চাইলে নীচের ফায়ারপ্লেসের কাছে মেলে দিতে পারি। ভিজে যাওয়া পঞ্চ আর উইন্ডচিটার জমা দিয়ে আমরা উপরে চলে গেলাম। শিশির আমাদেরকে রুমে নিয়ে গেলো। কানিজ সঙ্গে সঙ্গে কম্বলের ভেতর ঢুকে পড়লো, আমি বাথরুমে গিয়ে নিলাম গরম পানির গোসল—মনে হলো দিনের সব ক্লান্তি উবে গেলো গরম পানির ধোঁয়ার সঙ্গে।


তমালের গলার আওয়াজে বুঝলাম ওরা সদ্য ঢুকেছে। ততক্ষণে আমরা রেডি হয়ে নিচতলার রেস্টুরেন্টে নেমে এসেছি। চা অর্ডার দিয়ে আগুনের কাছাকাছি বসে পড়লাম। ভিজে কাপড়ের গন্ধের সাথে মিশে আছে কাঠ পোড়ার ধোঁয়া—এক অদ্ভুত আরামদায়ক গন্ধ। একে একে ফোন আর ক্যামেরা চার্জে দিয়ে দিলাম।


অন্য দলের এক গাইড কানিজকে ওয়াইফাইয়ের ব্যবস্থা করে দিল। কানিজের প্রথম কাজ—বাসায় বাচ্চাদের সাথে একটু কথা বলা, ভিডিও কলে ওদের মুখ দেখা। বাইরে যখন অবিরাম বৃষ্টি, তখন পর্বতের ভেতর থেকেও বাড়ির সাথে সংযোগ পাওয়া যেন অন্যরকম আশ্রয়।

আমাদের কারও বিশেষ খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না, ভ্রমণের ক্লান্তি আর আবহাওয়ার কারণে খিদে উধাও। কিন্তু কানিজ কিচেনে গিয়ে আলুভর্তার আয়োজন করে ফেললো। বুঝিয়ে বললো কীভাবে বানাতে হবে, যদিও রান্নাঘরের কেউ ওর কায়দা ধরতে পারলো না। শেষে ঠিক হলো—আলু সেদ্ধ হলে ভর্তা নিজেই করবে।


এরই মধ্যে তমাল-সুতপাও চলে এসেছে। চা হাতে, আগুনের পাশে বসে সকালের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বসা গেল। আমরা কান পাতলাম পরের দিনের রাস্তাঘাটের গল্পে।


ধৌলাগিরি অঞ্চলের এই বড়সড় গ্রামটি নেপালের ম্যাগদি জেলার অন্তর্গত। নাম শুনেই বোঝা যায়, কোথাও না কোথাও ঘোড়ার সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক রয়েছে। নেত্রাকে জিজ্ঞেস করতেই অনুমান মিললো—প্রাচীন বণিকেরা যখন এই পথ ধরে যেত, তারা এখানে বিশ্রাম নিতো, আর তাদের ঘোড়াগুলোর জন্য মিষ্টি ঝরনার পানি পেতো। সেখান থেকেই এই স্থানের নাম, ঘোড়েপানি।


কালের স্রোতে পথ বদলেছে। নতুন রাস্তা তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যপথ হিসেবে ঘোড়েপানি আজ আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু তার বদলে পাহাড়-প্রেমী ট্রেকারদের ভিড়ে ভরে উঠেছে গ্রাম। গ্রামবাসীর প্রধান আয়ের উৎস এখন পর্যটন—লজ, রেস্টুরেন্ট আর ছোটখাটো দোকানই গ্রামীণ জীবনের ভরসা।


সন্ধ্যার খাবারে ছিলো কানিজের হাতে বানানো আলুভর্তা, ডিমভাজি, নুডলস আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। হিমশীতল আবহাওয়ায় এই সামান্য খাবারগুলোও একেবারে রাজকীয় ভোজের মতো মনে হলো। লজের অভ্যাস অনুযায়ী, যাওয়ার আগে রুমে চলে এলো এক বোতল গরম পানি আর এক বোতল অল্প গরম পানি। এখানে গরম পানির বাইরে আর কিছুই গলায় ঢালা যায় না, ঠাণ্ডা যেন দেহকে ভেদ করে ঢুকে যায় ভেতরে ভেতরে।


সবশেষে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। পরদিন ভোরে উঠতে হবে, ভোর পাঁচটায়। কারণ, সামনের সকালেই অপেক্ষা করছে পুণ হিলের সূর্যোদয়, হিমালয়ের আকাশ ছুঁয়ে ওঠার মুহূর্ত।


পুনহিলে ভোরের আলোর খোঁজে |


সূর্যোদয় দেখা মানেই সূর্যের আগে ঘুম থেকে উঠে তার জন্য অপেক্ষা করা। তাই সূর্যোদয়ের বেশ আগেই ঘুম ভেঙে গেল। মনের মধ্যে এক অন্যরকম উত্তেজনা, আজ পুনহিলের চূড়ায় দাঁড়িয়ে হিমালয়ের বুকে সূর্যের প্রথম আলোর ছোঁয়া দেখব! সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,২০০ মিটার (প্রায় ১০,৫০০ ফুট) উচ্চতার এই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে হলে ঘোরেপানি থেকে ১,০০০ ফুট খাড়া পথ পাড়ি দিতে হয়। পুরোটাই চড়াই আর অসংখ্য সিঁড়ি। সাধারণত, এই পথটুকু হাঁটতে ৪৫ মিনিট লাগে, কিন্তু আমাদের মতো মানুষের জন্য সে সময়টা দ্বিগুণ হওয়াই স্বাভাবিক।


এই ট্রেকটিকে অনেকে সহজ বললেও, মোটেও তেমনটা নয়। পাহাড়ের গা বেয়ে ক্রমাগত উপরে উঠতে থাকা বেশ কষ্টসাধ্য। মনটা এক রোমাঞ্চকর ভাব নিয়ে তৈরি হলো, যেন আমরা কোনো কঠিন সামিট পুশ করতে যাচ্ছি। তৈরি হয়ে লজ থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখি, আমাদের লজের সামনে দিয়েই পথটি উপরের দিকে চলে গিয়েছে।


চারপাশ তখন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। ঘড়িতে কটা বাজে বোঝার উপায় নেই। শুধু ট্রেকিং পোলের ‘টুক টুক’ শব্দ ঘন নির্জনতাকে ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের মাথায় বাধানো হেড ল্যাম্পের আলো জোনাকির মতো জ্বলছে। জমাট বাঁধা অন্ধকারকে সরিয়ে আলোর এক সরু রেখা তৈরি করে আমরা সারি বেঁধে উপরে উঠে যাচ্ছি।


কিছুদূর ওঠার পর একটি তোরণের সামনে থমকে দাঁড়াতে হলো। এখানে টিকিট কাটতে হবে। জনপ্রতি ১৫০ রুপি। টিকিট কেটে আবারও হাঁটা শুরু করলাম, এই যাত্রা শুধু একটি পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর নয়, এটি প্রকৃতির মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করারও এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।


আমাদের এবারের ট্রেকের মূল লক্ষ্য দুটি—প্রথমটি হলো পুন হিলে সূর্যোদয় দেখা, আর দ্বিতীয়টি অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানো। আজ আমাদের প্রথম লক্ষ্য পূরণের দিন। পুন হিল সানরাইজ ট্রেকটি এতটাই জনপ্রিয় যে অনেকে এটি আলাদাভাবে করেন। আবার আমাদের মতো অনেকেই অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্প (ABC) ট্রেকের অংশ হিসেবে এটি করেন।


টি-হাউসের দাদা জানালেন, ভরা মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ২,৫০০ ট্রেকার পুন হিলে ওঠেন। পোখারা থেকে শুরু করে এই ট্রেক ৪-৫ দিনে শেষ করে ফিরে আসা যায়। এই সংক্ষিপ্ত ট্রেকটি যে সৌন্দর্যের মুখোমুখি করায়, তা মোটেই সংক্ষিপ্ত নয়, বরং চিরন্তন। মনের মধ্যে যে রোম্যান্টিসিজম বাসা বাঁধে, তা সারাজীবন ধরে কারণে-অকারণে জানান দিতে থাকে।


পুন হিল থেকে দেখা সূর্যোদয়ের শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যটি প্রকৃতির সৌন্দর্য ও শক্তির এক উজ্জ্বল প্রমাণ। এটি এমন একটি মুহূর্ত যা আপনি কখনোই ভুলবেন না। মনে হয় যেন কোনো উন্মাদ শিল্পীর আঁকা এক জীবন্ত ছবি।


পুন হিলের নামকরণের পেছনে একটি আকর্ষণীয় উপাখ্যান রয়েছে, যা এর প্রতিষ্ঠাতা মেজর টেক বাহাদুর পুনের সঙ্গে জড়িত। প্রায় ৪৫ বছর আগেও এই পাহাড়টি 'লুমথুং কো ডান্ডা' নামে পরিচিত ছিল।ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর টেক বাহাদুর পুন এই অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন এবং এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা তাকে মুগ্ধ করে। তিনি দেখলেন যে, পাহাড়টি মূলত 'পুন' জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসতি, যারা মাগার সম্প্রদায়ের একটি অংশ। তাদের সম্মান জানাতে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পাহাড়টিকে যুক্ত করতে তিনি 'লুমথুং কো ডান্ডা'র নাম পরিবর্তন করে পুন হিল রাখেন।

এই নামকরণের মাধ্যমে তিনি কেবল পাহাড়ের পরিচয় পরিবর্তন করেননি, বরং এর সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী বন্ধনও তৈরি করেছেন। বর্তমানে, পুন হিল তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এই ঐতিহ্যবাহী নামের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।


অন্ধকার তখনও ঘন। কানিজ হাঁপাচ্ছে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে। এবারে ট্রেকে আজকেই প্রথম ধীরে ধীরে উচ্চতা অর্জন করছি, হয়তো সেই কারণেই তার শরীরে এতটা চাপ পড়ছে। আমার মনে শঙ্কা জাগলো, এভাবে চললে পুনহিলে পৌঁছানো যাবে ঠিকই, কিন্তু সূর্যোদয়ের সেই অভীষ্ট মুহূর্ত ধরা দেবে না। এক মুহূর্তের জন্য মনটা খারাপ হয়ে এলো।


কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো—এই কষ্টটা সে নিয়েছে কেবল আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। শুধু এই ভাবনাটুকুই আমার হৃদয়কে অদ্ভুত এক খুশিতে ভরে দিলো।


এমন সময় ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে চারদিকে। আমরা এসে পৌঁছালাম ওপরে। অন্ধকারের আস্তরণ ভেদ করে আমরা দাঁড়িয়ে আছি পুনহিলের চূড়ায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,২১০ মিটার উচ্চতার এই ভিউপয়েন্ট অন্নপূর্ণা অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থানগুলোর একটি।


পূর্ব দিগন্তে আলোর আভা ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। প্রথমে আকাশে শুধু ধূসর রেখা, তারপর যেন অদৃশ্য তুলির আঁচড়ে সোনালি রং মিশতে শুরু করলো। চারপাশের ট্রেকারদের ভিড় হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল, সবাই যেন একযোগে শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে মহামুহূর্তটির জন্য।পূর্ব দিগন্তে আলোর আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎই সূর্যের প্রথম কিরণ এসে ধরা দিলো—মুহূর্তের মধ্যেই ধৌলাগিরি (৮,১৬৭ মিটার) তার গম্ভীর তুষারময় কপাল উঁচিয়ে ঝলসে উঠলো। একটু পরেই অন্নপূর্ণা দক্ষিণ (৭,২১৯ মিটার) আর হিমচুলি (৬,৪৪১ মিটার) সোনালি আভায় ভরে গেল। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তাকালেই দেখা যায় অনিন্দ্য সুন্দর মাছপুচ্ছ বা মচ্ছাপুচ্ছ্রে (৬,৯৯৩ মিটার), যেন আকাশে জ্বলন্ত প্রদীপের শিখা।


এই ভিউপয়েন্ট থেকে একসাথে দেখা যায় হিমালয়ের ২০টিরও বেশি শৃঙ্গ। উত্তর-পশ্চিমে ধৌলাগিরি, অন্নপূর্ণা, গঙ্গাপূর্ণা; পূর্বে মচ্ছাপুচ্ছ্রে, দক্ষিণে হিমচুলি—এ যেন সাদা আগুনে গড়া এক প্রাচীর, যার উপরে প্রতিদিন সকালে সূর্যের আঁচল ছুঁয়ে যায়।


চারপাশে পর্যটকদের ভিড় থাকলেও মুহূর্তটি একেবারে ব্যক্তিগত মনে হলো। কানিজ হাঁপাতে হাঁপাতে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো, নিঃশ্বাসের শব্দ মিশে গেল হিমালয়ের শীতল বাতাসে। পাহাড়ের বুক থেকে জন্ম নেওয়া ঠাণ্ডা হাওয়া শরীরে কাঁপন ধরাচ্ছে, কিন্তু অন্তরের ভেতর যেন এক আগুন জ্বলে উঠেছে।

কেন পাহাড়ে আসি, কেন এই দুঃসাহসী পথ পেরোই—সেই প্রশ্নের উত্তর যেন এখানেই মেলে। সূর্যোদয়ের এই কয়েক মিনিটই জীবনের শত ব্যথা, ক্লান্তি আর শূন্যতার উত্তরে রূপ নেয়।


Share on social media