হাইরাপোলিসের ধ্বংসস্তুপে
সকাল থেকে আন্তালিয়ার কালেজির গলিঘুঁজিতে প্রায় আধাদিন ধরে চক্কর খেয়ে আড়াইশ কিলোমিটার দূরের হাইরাপোলিসে যখন পৌঁছি, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে টিকিট ঘরের সামনে গিয়ে ক্রেডিট কার্ড বাগিয়ে ধরি। কাউন্টারের ভেতরে বসা তরুণী কার্ড পাঞ্চ করার পর জানায়, কার্ড নিচ্ছে না। বললাম, আরেকবার চেষ্টা করে দেখলে হয় না? অনেক সময় প্রথমবার না নিলেও পরের বার নেয়। নাহ্, এবারেও হয় না। তুর্কি তরুণীর কাছে ইজ্জতের সওয়াল। এবার অন্য ব্যাংকের কার্ড বের করি। এটাও দুবারের চেষ্টায় বিফল হয়। দুটোই ছিল ভিসা কার্ড। এবার এমেক্স কার্ড বের করে দিলে ওটার দিকে একঝলক তাকিয়ে মেয়েটা জানিয়ে দেয়, ওরা এমেক্স কার্ড নেয় না। কেবল এরা নয়, আরো বহু জায়গায় দেখেছি, চোখ বুঁজে আমেরিকান ডলার নিলেও আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডে ওদের অরুচি।
কাপাদোকিয়া থেকে আমাদের সঙ্গে আসা আয়নুরকে বেশ উৎকণ্ঠিত দেখায়। সে মেয়েটির সঙ্গে তুর্কি ভাষায় কিছুক্ষণ কথা বলে, ওর মুখের অভিব্যক্তিতে বোঝা যায়, আলোচনা বিফল হয়েছে। এবারে বললাম, ক্যাশ ডলার দিলে চলবে? না, ক্যাশ দিলে ইউরো অথবা তুর্কি লিরা দিতে হবে। কিন্তু এত ইউরো তো নেই, ইস্তাম্বুলে প্রায় সব ভাঙিয়ে ফেলেছি। মনে পড়লো, গাড়িতে রাখা ব্যাগের মধ্যে যথেষ্ট লিরা রাখা আছে। আয়নুরকে বলি, গাড়িতে লিরা আছে, সেখান থেকে নিয়ে আসি। এখন ড্রাইভারকে খুঁজে পেলেই হয়। আয়নুর আমার সঙ্গে গাড়ির কাছে যায়। ড্রাইভার আশপাশে কোথাও নেই। ওকে ফোন করতে হবে, কিন্তু আয়নুরের ফোনে চার্জ নেই। কি একটা অবস্থা! গাছের নিচে, দোকানের সামনে এত মানুষকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের ড্রাইভার নেই। অগত্যা আয়নুর সেখানে বসে থাকা একজনের কাছ থেকে ফোন চেয়ে নিয়ে ড্রাইভারকে ধরতে পারে। ওয়েইস্টকোট আর টাই পরা মোটাসোটা ড্রাইভার তুঞ্জের আসে হেলেদুলে। তারপর গাড়িতে রাখা ব্যাগ থেকে লিরাভর্তি খামটা নিয়ে আবার কাউন্টারে গিয়ে গুনে গুনে যা দিতে হলো সেটা বাংলাদেশী মুদ্রায় জনপ্রতি ৪০০০ টাকার মতো।
ক্রেডিট কার্ড বিভ্রাটে টিকিট কেনা যখন ভেস্তে যেতে বসেছিল, তখন খর রোদের মধ্যে ২৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড গরমে প্রায় এক কিলোমিটার পথ আসা—যাওয়া করে হাঁপিয়ে পড়েছিলাম। গাড়িতে নগদ লিরাগুলো না থাকলে হয়তো রোমান যুগের প্রাচীন জায়গাটা না দেখেই ফিরে যেতে হতো। সাধারণত এরকম পরিস্থিতিতে স্থানীয় গাইডেরা মুশকিল আসান করে দেয়, কিন্তু আজ কেবল ড্রাইভারকে ফোন করার কাজটুকু ছাড়া আর কোনো কাজে লাগেনি এই মহিলা। তা—ও নিজের ফোন থেকে করতে পারেনি, অন্য একজনের ফোন চেয়ে নিতে হয়েছে ওকে। আরো দুদিন আমাদের সঙ্গেই থাকবে ও, ওর ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড থেকে টিকিট কিনে দিতে পারত সে, পরে টাকাটা দিয়ে দিতাম। সম্ভবত আমার কাছে লিরা আছে জানার পর নিজের কার্ড থেকে টিকিট কেনার প্রস্তাব দেয়নি। সেবার আসামের কাজীরাঙ্গা জঙ্গল সাফারিতে গিয়ে কোনো সিম কার্ড কিনতে পারিনি বলে আমাদের চালক ও গাইড পরাগ স্বেচ্ছায় ওর দুটো সিম কার্ডের একটা আমাকে দিয়ে রেখেছিল।
যা—ই হোক, শেষপর্যন্ত যে দুই হাজার বছরের প্রাচীন নগরীতে ঢুকতে পেরেছি, সেটাই আসল কথা। নগরীর দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে ঢোকার পর পেরিয়ে যেতে হয় বড় বড় পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি রোমান গেট। এটাতে ব্যবহার করা হয়েছে ট্র্যাভারটাইন নামের এক বিশেষ ধরনের পাথর। তার সঙ্গে লাগানো আগের ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া কোনো ভবনের মার্বেল। ভেতরে ঢোকার পর অক্ষত দাঁড়িয়ে থাকা এমনকি জরাজীর্ন কোনো ভবনও চোখে পড়ে না। বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় যুদ্ধের ময়দানে মৃত সৈনিকের মতো ইতস্তত পড়ে আছে বিভিন্ন ইমারত কিংবা স্তম্ভের ভাঙাচোরা অংশ। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর মূল রাস্তার বাম পাশে পশ্চিম দিকে দাঁড়িয়ে আছে মোট পাঁচটি ডরিক স্তম্ভ। প্রথমে একজোড়া, ওগুলোর মাথায় খিলানের একটা টুকরো, সেখানে খোদাই করে গ্রিক হরফে লেখা, এণগঘঅঝওঙঘ, অর্থাৎ জিমনেশিয়াম। তারপর মাথা ভেঙে পড়া থাকা অর্ধেক দুটো থামের পর আবার তিনটি পাশাপাশি। ওগুলোর ওপর খিলান। তার ওপর লেখা বঢ়রঃড়সরড়হ কিংবা বঢ়রঃড়হরড়ং, তবে এটার কোনো অর্থ আবিষ্কার করা যায়নি। ধারণা করা হয় খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীতে জিমনেশিয়ামের খোলা চত্বর ঘিরে ছিল দাঁড়ানো ছিল এই ডরিক স্তম্ভগুলো। সপ্তম শতাব্দীর তীব্র ভূমিকম্পে পুরো নগরীর সঙ্গে এগুলোও ভুতলশায়ী হয়েছিল। দেখলে বোঝা যায় পরবর্তী সময়ে এই ভেঙে পড়া এই পাঁচটাকে মেরামত করে খাড়া করা হয়েছে। খিলানগুলোও যে আলগাভাবে বসানো, সেটা স্পষ্ট, হালকা ভূমিকম্প হলেই খসে পড়বে। এখানে উল্লেখ করা যায়, প্রাচীন গ্রিক ভাষায় জিমনেশিয়াম শব্দটির অর্থ ছিল নগ্ন শরীরচর্চার জায়গা। গ্রিক ভাষায় ‘জিমনো' শব্দের অর্থ নগ্ন।
বিভিন্ন সময়ে বহু ঝড়ঝাপটা সহ্য করে খ্রিষ্টের মৃত্যুর তেরোশ বছর পর সম্পূর্ণ বিরান হয়ে গিয়েছিল হাইরাপোলিস। অথচ এশীয় অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটেছিল খ্রিষ্টজন্মের একশ বছরেরও বেশি সময় আগে। এভাবেই গোড়াপত্তন হয়েছিল হাইরাপোলিস নগরীর। ১৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ভূমিকম্পে শহরটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এসময় থেকে মূলতঃ খ্রিষ্টধর্মের প্রচার ও প্রসার শুরু হয়েছিল। এসময় এখানে স্থাপিত হয়েছিল প্রথম গির্জা।
হাইরাপোলিস নামের উৎস সম্পর্কে একাধিক মত চালু আছে। অনেক মন্দিরের উপস্থিতির কারণে এটা ছিল একটা ধমীর্য় স্থান, সে হিসেবে ‘পবিত্র নগরী’ নামটা ঠিকই আছে। গ্রিক উপনিবেশ হওয়ার আগে এখানে আনাতোলিয়ার দেবীর উপাসনা করা হতো। এটার পাশেই যে উষ্ণ প্রস্রবণ আছে, সেখান থেকে বিষাক্ত গ্যাস বের হতো বলে এটাকে পাতালপুরীর দরজা হিসেবে মনে করত কেউ কেউ। দেবী সিবিলি ও পার্সিফোনি এবং দেবতা হেডিসের সম্পৃক্ততা থাকার কারণেও এই নগরীকে পবিত্র বলে মনে করতো মানুষ। দ্বিতীয় একটা মত হচ্ছে কিংবদন্তীর চরিত্র টেলিফাসের স্ত্রী হাইরার নামের সঙ্গে মিলিয়ে এই নগরীর নামকরণ করা হয়েছিল।
খ্রিষ্টজন্মের দুইশ বছর আগে থেকে হাইরাপোলিসের অর্থনীতি বিকশিত হয়েছিল সেখানকার শ্রমনির্ভর বস্ত্রশিল্পকে ঘিরে। এখানে মূলতঃ তৈরি হতো উল ও লিনেন কাপড়। প্রাচীন নগরীর পাশে যে উষ্ণ খনিজ জলের প্রবাহ ছিল, সেই পানি ব্যবহৃত হতো উৎপাদিত কাপড় ধোয়া ও রঙ করার কাজে। রাজা তৃতীয় এনতায়োকুসের শাসনামলে (খ্রিষ্টপূর্ব ২২৩- ১৮৭) প্রায় দুই হাজার ইহুদি পরিবার মেসোপটেমিয়া অঞ্চল থেকে এখানে চলে এসেছিল, খ্রিষ্টিয় শতাব্দী শুরু হতে হতে হাইরাপোলিসে তাদের বিশাল এক জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। এদের মধ্য থেকে বহু ইহুদি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। ফলে দ্রুত বাড়তে শুরু করে নগরীর সমৃদ্ধি। প্রথমবারের ভূমিকম্পের পরের দুইশ বছরের মধ্যে শুরু হয়েছিল হাইরাপোলিসের স্বর্ণযুগ। ২১৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট কারাকাল্লার সফরের সময় এই নগরীকে দেওয়া হয় দেবস্থান সংরক্ষকের বিশেষ মর্যাদা ও উপাধি: ‘নেওকোরোস।’ ফলে হাজার হাজার মানুষ এই নগরী সফরে আসতো মূলতঃ তীর্থস্থান দর্শন ও উষ্ণ জলের আকর্ষণে। পর্যটন থেকে আসা আয়ের কারণে নগরীর আর্থিক অবস্থান শক্ত হয়, গড়ে ওঠে নতুন নতুন স্থাপনা, হামাম, স্কুল, গির্জা, সুদৃশ্য পথঘাট। সেই সঙ্গে শিল্পকলা, দর্শন ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে হাইরাপোলিস। চতুর্থ শতাব্দীতে আরেকটি ভূমিকম্পে এই নগরীর বহু গুরুত্বপূর্ণ ভবন বিধ্বস্ত হয়। আর তখন থেকে ভাটা পড়তে শুরু করে নগরীর সমৃদ্ধিতে। সপ্তম শতাব্দীর আরেকটা ভূমিকম্পে পুরো শহরটাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তারপর রাজকীয় অর্থসাহায্যে রোমান শৈলিতে নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছিল শহরটিকে।
খ্রিষ্টধর্মের অভ্যুদয়ের পর এই ধর্মের প্রসারে হাইরাপোলিসের যথেষ্ট অবদান ছিল। রোমান সম্রাট ডোমিটিয়ানোসের শাসনামলে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের অপরাধে এখানেই খুন করা হয় যিশুর বারো শিষ্যের মধ্যে সেইন্ট ফিলিপকে। তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল উল্টো করে ঝুলিয়ে। তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল হাইরাপোলিসের সমাধিক্ষেত্রে। যদিও তাঁর সমাধির জায়গাটা চিহ্নিত ছিল না। ২০১১ সালে ইতালীয় প্রত্নতাত্ত্বিক দান্দ্রেয়া ফিলিপের মূল সমাধির জায়গাটা আবিষ্কার করতে পেরেছেন বলে দাবি করেন। তবে তাঁর দাবি সত্য হলেও ফিলিপের দেহাবশেষ সেখান থেকে রোমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে। ফিলিপের প্রথম সমাধির কারণে খ্রিষ্টানদের তীর্থস্থানে পরিনত হয়েছিল এই প্রাচীন নগরী। প্রায় তিনশ বছর পর হাইরাপোলিস বাইজেন্টাইনদের নিয়ন্ত্রণে আসে। রোমান সম্রাটদের মধ্যে প্রথম খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত কনস্টানটাইন এটিকে ফ্রিজিয়া রাজ্যের রাজধানী এবং বিশপশাসিত কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন।
সম্রাট নিরোর শাসনামলে ৬০ খ্রিষ্টাব্দে আবারও এক মারাত্মক ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এই নগরী। এসময় একদা সমৃদ্ধ এই নগরীতে বাস করত গ্রিক, রোমান, সমৃদ্ধ ফ্রিজিয়ান ও ইহুদি জনগোষ্ঠী মিলিয়ে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ। রাজকীয় অর্থসাহায্যে ব্যাপক সংস্কার করে আবারও নির্মিত হয় এই শহর। ধ্বংসস্তুপে পরিনত হওয়া শহরটির পাথর বিছানো প্রশস্ত রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে যেতে বোঝা যায় রোমান মহাসড়ক এসে রোমান স্থাপত্যরীতিতে তৈরি বাঁকানো তিন খিলানের ফটক পেরিয়ে মিলে গিয়েছিল হাইরাপোলিসের ভেতরের রাস্তার সঙ্গে। মূল সড়কের পাশে রাস্তার সমতল থেকে উঁচু ফুটপাত দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে একটা পরিকল্পিত নগরীর উৎকর্ষের সাক্ষ্য দেয়। একই ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়েছিল হাইরাপোলিস থেকে মাইল দশেক দূরের আরেকটা সমৃদ্ধ রোমান নগরী লেওডিসিয়া। এই নগরী এতই স্বচ্ছল ছিল যে ভুমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজে রাজকীয় কোনো অর্থ সাহায্য নিতেও অস্বীকার করেছিল নগর কতৃর্পক্ষ। প্রকৃতপক্ষে লেওদিসিয়ার শাসনকর্তা গির্জা সম্পদশালী ছিল বলে স্বয়ং যিশু তাদের ভর্ৎসনা করেছিলেন যোহনের মাধ্যমে, যার উল্লেখ আছে বাইবেলে, ‘তুমি বলছ, “আমি ধনী, আমার ধনসম্পদ হয়েছে, আমার কিছুরই অভাব নেই,” কিন্তু তুমি জানো না যে তুমি তো দুর্দশাগ্রস্ত, করুণার পাত্র, দরিদ্র, অন্ধ ও নগ্ন।’ কিছু ধনী ব্যাংকার এই নগরীর গির্জার সদস্য ছিলেন বলে নিজেকে ধনী ও সমৃদ্ধ মনে করত গির্জা। অথচ যীশু মনে করতেন তারা ছিল আধ্যাত্মিকভাবে দেউলিয়া দরিদ্র।
জিমনেশিয়ামের খাড়া ডরিক স্তম্ভগুলো পেরিয়ে গেলে হাতের ডানে দূরে আবছা দেখা যাচ্ছিল একটা অ্যাম্ফিথিয়েটারের কাঠামো, ক্যামেরার লেন্স জুম করে দেখা গেল গ্যালারির সিঁড়িগুলোর একাংশ প্রায় অক্ষত। এটাই হাইরাপোলিসের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে টিকে থাকা সবচাইতে বড় স্থাপনা। রোমান স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত অ্যাম্ফিথিয়েটার হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে গোল কিংবা ডিম্বাকৃতিতে ঘিরে থাকা দর্শকগ্যালারির মধ্যখানে মূল মঞ্চ কিংবা মাঠ। চারদিক ঘেরা গ্যালারিতে বসে গ্ল্যাডিয়েটরদের মরণপণ যুদ্ধ, কিংবা পশুহত্যার প্রদর্শনী দেখতো হাজার হাজার দর্শক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম দুই শতাধিক অ্যাম্ফিথিয়েটারের অংশ কিংবা ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে। এগুলোর মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাতটি হচ্ছে, রোমের কলোসিয়াম। ইতালির পম্পেইতেও রয়েছে এরকম আরেকটা। তবে রোমের কলোসিয়ামের মতো কোনোটিই এত বিশাল ও বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত নয়।
হাইরাপোলিসের দক্ষিণ অংশের প্রায় কোনোকিছুই মাটির ওপর খাড়া নেই। অ্যাপোলো মন্দিরের সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ চেনা যায়, তবে ছোট একটা অংশই কেবল সিঁড়ির আকৃতি নিয়ে রয়ে গেছে। সামনে পড়ে আছে স্তম্ভের কয়েকটা টুকরো। কারুকাজ করা কয়েকটা পাথরখণ্ড দেখে বোঝা যায় এগুলো একসময় ছিল স্তম্ভের মাথা, কিংবা ছিল খিলানের অংশ। ভাঙাচোরা সিঁড়িগুলো যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে খাড়া আছে মাত্র দেড়খানা স্তম্ভ। এই ধ্বংসস্তুপের সামনে অ্যাপোলো মন্দিরের পথনির্দেশ না থাকলে বোঝার উপায় নেই, এটা রোমান সা¤্রাজ্যের সেই বিখ্যাত স্থাপত্য। রোমান সভ্যতার নগরীগুলোতে সূর্যদেব অ্যাপোলোর মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল প্রায় অপরিহার্য। গ্রিস, রোম, কনস্টান্টিনোপল—যেখানেই রোমান নগরী ছিল, সেখানেই তৈরি করা হয়েছিল সূর্যদেবের মন্দির। সম্ভবত সংস্কারের কারণে হাজার বছর ধরে আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা ইতালির পম্পেই নগরীর অ্যাপোলো মন্দিরের স্তম্ভ খিলানগুলো হাইরাপোলিসের ভগ্নস্তুপের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান ও খাড়া।
অ্যাপোলো মন্দিরের দক্ষিণ পাশে ছিল দেবতা প্লুটোর মন্দির, প্লুটোনিয়ন। এখন আর মন্দিরটি নেই, আছে কেবল রহস্যময় এক গুহামুখ। খ্রিষ্টজন্মের অনুমিত তিনশ বছর আগে এই মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এখানকার মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে মন্দিরের নীচে আছে পাতালপুরীতে যাওয়ার পথ। সংকীর্ণ গুহামুখের পর নেমে গেছ পাথুরে সিঁড়ির ধাপ। গুহার নীচের পাথরে আছে এক গভীর ফাটল। তার নীচে উষ্ণ জলের ধারা, সেখান থেকে নিগ্রত হতো একধরনের গ্যাস। বিশ্বাসী মানুষদের জানানো হয়েছিল, এই পাতালপুরীতেই থাকেন দেবতা প্লুটো, আর এখান দিয়েই পৌঁছানো যায় প্লুটোর কাছে। তাই এটার আরেক নাম ‘নরকের দ্বার।’
খুব বেশি দিন হয়নি, ২০১৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে আবিষ্কৃত হয়েছে এই উষ্ণ জলের প্রস্রবণই পামুক্কালের প্রাকৃতিক ঝর্ণার মূল উৎস। মানুষ বিশ্বাস করতো, ভূগর্ভ থেকে উৎসারিত এই জলের মধ্যে রয়েছে রোগ উপশমের ক্ষমতা। তাই এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে ধর্মীয় বুজরুকিও কম হয়নি। স্থানীয় অধিবাসীরা বিশ্বাস করত, পাতালপুরীতে ঢোকার চেষ্টা করলে দেবতা প্লুটো ক্ষুব্ধ হন। অবিশ্বাসীরা গুহায় ঢুকলে তাদের মৃত্যু অবধারিত। বস্তুত, এই গুহার ভেতর ঢুকে বহু কৌতূহলী মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল, পশুপাখিও মরতো প্রচুর।
রহস্যময় গুহাটার অলৌকিকত্ব প্রমাণ করার জন্য পুরোহিতেরা প্রচার করেছিলেন যে দেবতার প্রতিনিধি হিসেবে একমাত্র তাদেরই রয়েছে গুহায় ঢোকার অধিকার। সাধারণ মানুষ তাঁদের ভাবতেন দেবতার প্রতিনিধি। এটা প্রমাণ করার জন্য নিশ্বাস বন্ধ করে গুহায় ঢুকতেন তাঁরা। সেখানে কিছুসময় কাটিয়ে বেরিয়ে আসতেন আবার। মানুষ সরল বিশ্বাসে মনে করতো সত্যিই তাঁরা দৈব ক্ষমতার অধিকারী। পুরোহিতদের প্ররোচনায় গুহার ভেতর দেবতা প্লুটোর অস্তিত্ব মেনে নিয়ে তাঁকে তুষ্ট করার জন্য স্থানীয় অধিবাসীরা বলী দেওয়ার জন্য পশু বা পাখির পায়ে দড়ি বেঁধে ছুঁড়ে দিত গুহার ভেতর। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যেত প্রাণীগুলো। তারপর তাদের প্রাণহীন শরীর বাইরে নিয়ে এসে সেগুলো পুড়িয়ে পোড়া মাংস বিতরন করা হতো প্রসাদ হিসাবে। বলী দেওয়া প্রাণীগুলোকে কিনতে হতো পুরোহিতদের কাছ থেকেই।
তবে পরবর্তী সময়ের গবেষণায় উদঘাটিত হয় এই বুজরুকির রহস্য। গবেষকরা দেখেছেন মন্দিরের নীচের গুহার ভেতরে ছিল প্রচুর পরিমাণে গ্যাস এবং খনিজ উষ্ণ জলের ধেঁায়া। এই গ্যাসের প্রভাবেই মারা পড়তো মানুষ ও পশুপাখি। তবে গুহার ভেতর তবে ভেতরে কিছু খোপ ছিল, সেখানে জমা থাকত কিছু অক্সিজেন, যা কার্বন—ডাই—অক্সাইডের চাইতে হালকা ছিল বলে খোপের ওপরের অংশে ভেসে থাকত। পুরোহিতেরা এই খোপগুলোর কথা জানতেন বলে সেই খোপ থেকে অক্সিজেন নিয়ে আবার দম চেপে বেরিয়ে আসতেন গুহা থেকে। এভাবেই মন্দিরে দান—খয়রাত করার জন্য সরল বিশ্বাসী মানুষদের প্রলুব্ধ করতেন পুরোহিতেরা। নির্দিষ্ট দক্ষিণার বিনিময়ে দেবতা প্লুটোর দৈবাদেশও এনে দিতেন পুরোহিতেরা। এভাবেও তাঁরা অর্জন করেছিলেন প্রচুর সম্পত্তি।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় জানা যায়, খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত চালু ছিল প্লুটোনিয়ন। ষষ্ঠ শতকে খ্রিষ্টানরা ভেঙে দেয় প্লুটোর মন্দির। পরবর্তী সময়ে ধ্বংসযজ্ঞটা সম্পূর্ণ হয় আরেক দফা ভূমিকম্পের কারণে, পুরো মন্দিরটাই চলে গিয়েছিল পাতালপুরীর দেবতার কাছে। ২০১৩ সালে ইতালীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ দান্দ্রেয়ার নেতৃত্বে এই মন্দির যখন উদ্ধার করা হয়, তখনও সক্রিয় ছিল গুহার ভেতরের কার্বন—ডাই—অক্সাইড গ্যাস। তিনি বলেন, ‘খননকাজের সময় গুহাটার প্রাণঘাতী ক্ষমতা দেখতে পাই আমরা। কয়েকটা পাখি গুহামুখের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতেই কার্বন—ডাই—অক্সাইডের ধেঁায়ায় মুহূর্তের মধ্যে মারা পড়ে।’
প্লোটো—মন্দিরের গুহামুখটার কাছে দর্শনার্থীদের যেতে দেওয়া হয় না বলে সেদিকে যাওয়ার কোনো আগ্রহ পাই না। আমাকে টানছিল দূরের অ্যাম্ফিথিয়েটারের গ্যালারিগুলো। তাই হাইরাপোলিসের আপাত দৃশ্যমান বড় স্থাপনা অ্যাম্ফিথিয়েটা লক্ষ্য করে হাঁটতে শুরু করি। দৃষ্টিসীমার মধ্যে হলেও ঘুরপথে যেতে হবে বলে দূরত্ব এক থেকে দেড় কিলোমিটার হতে পারে। মেঘমুক্ত আকাশে সূর্যের তাপ অসহনীয় না হলেও আবহাওয়া শীতল নয়। অর্ধেক পথ আসার পর ট্যুরিস্টদের নিয়ে কয়েকটা শব্দহীন গলফকার্ট আমাদের পেরিয়ে গেলে বুঝতে পারি, এরকম একটা ভাড়া নিলে পথশ্রম কিছুটা লাঘব হতো। এরকম বাহন যে ভাড়া নেওয়া যায়, জানা ছিল না। অথচ গাইড আয়নুরের জানা উচিত ছিল। মহিলা যে খুব দক্ষ গাইড নয়, সেটা পদে পদে টের পাচ্ছিলাম। অগত্যা সেই খর রোদের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাই। আরো বহু দর্শনার্থীকে পায়ে হেঁটে সেদিকে যেতে দেখার পর বুঝতে পারি, গাড়িতে চড়ে না যাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাই হেঁটে যাওয়ার কষ্ট কিছুটা কমে আসে।
দূর থেকে গ্যালারির একাংশ দেখা গেলেও কাছে থেকে সামনের দিকের বাইরের অংশটা দেখে বোঝার উপায় চারপাশে ছড়ানো ধ্বংসস্তুপের মধ্যিখানে ভেতরে কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে।
বেশ কিছুটা চড়াই ভেঙে রোদে পুড়ে অ্যাম্ফিথিয়েটারের ওপরের ধাপে পৌঁছানোর পর প্রথমেই নজর কাড়ে অক্ষত অর্ধবৃত্তাকার গ্যালারির সারি। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত মোট ৪৫ ধাপ আসন সারি, তার আধাআধি নেমে এলে একটা চওড়া ওয়াকওয়ে, তারপর সেখান থেকে আবার নেমে গেছে বাকি ধাপগুলো। তিনদিক ঘেরা গ্যালারি চিড়ে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নেমে গেছে আলাদা আটটা সিঁড়ি, সেই সিঁড়ি বেয়ে গ্যালারির আসনগুলোতে পৌঁছাতে পারে দর্শকেরা। সিঁড়িতে পৌঁছানোর জন্য দর্শকদের জন্য রয়েছে চারটা বাঁকানো খিলানের দরজা। গ্যালারির প্রতি ধাপে বসতে পারত তিন শতাধিক দর্শক, সেই হিসেবে প্রায় ১৫ হাজার দর্শকের বসার ব্যবস্থা ছিল এখানে। গ্যালারির শেষ ধাপের সামনে একটা বৃত্তের আধফালি ঘাসে ঢাকা চত্বর, যাকে বলা হয় ‘অর্কেস্ট্রা'।
নিচের সিঁড়িগুলোর মাঝামাঝি জায়গায় কয়েক ধাপ গ্যালারিজুড়ে অর্কেস্ট্রার দিকে মুখ করা মার্বেল পাথরের একটা অর্ধবৃত্তাকার বেষ্টনিতে রয়েছে বিশেষ আসন ব্যবস্থা। এটাকে ল্যাটিন ভাষায় বলা হয় ‘ট্রাইবুনালিয়া।’ এটার ধাপগুলো অন্যগুলোর চাইতে চওড়া ও আলাদা। বাড়তি সাজসজ্জার এই জায়গাটা ছিল ভিআইপি গ্যালারি। যাজক, গন্যমান্য ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত থাকত এই জায়গাটা। গ্যালারির অন্য অংশের মতো এটার মার্বেল পাথরের এখানে সেখানে ফাটল দেখা দিয়েছে, ভেঙে পড়েছে কিছু অংশ। ফাটল ধরা সেই মার্বেল পাথরের আসনে বসেই খুব কাছে থেকে বিশিষ্ট মানুষেরা উপভোগ করতে পারতেন মল্লযুদ্ধ কিংবা পশুর সঙ্গে মানুষের মরণপণ যুদ্ধের মতো বিভৎস ক্রীড়া। ট্রাইবুনালিয়ার দুপাশের পাথরের মেঝের ওপর চারকোনা গর্ত। বিশিষ্ট অতিথিদের আসনের ওপর সামিয়ানা কিংবা চাঁদোয়া টানানোর খুঁটি পোঁতার জন্য রাখা হয়েছিল এগুলো।
অর্কেস্ট্রার পেছন থেকে গ্যালারির দিকে মুখ করা একতলা সমান উঁচু মঞ্চের পাটাতন বসানো আছে এগারোটি করিন্থীয় স্তম্ভের মাথায়। স্তম্ভের গায়ে পেঁচিয়ে ওঠা ঢেউখেলানো নকশা, মাথার দিকে রোমান স্থাপত্যের পরিচিত লতাকুণ্ডলির মধ্যে পাতার মোটিফ। স্তম্ভের মাথায় খিলানের গায়েও লতানো নকশার কারুকাজ। এগুলোর পেছনে রয়েছে তিনটি দরজা আর ছয়টি অলিন্দ। মাঝের খোলা দরজার দুপাশের দুটো দরজাই ইটের দেয়াল গেঁথে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফাঁকা অলিন্দগুলোর বাঁকানো খিলান থেকে ঢালু হয়ে নেমে এসেছে সামুদ্রিক ঝিনুকের নকশার আদলের ছাদ।
ওপরের মূল মঞ্চের পেছনে আছে কারুকাজ করা মোট চৌদ্দটি করিন্থীয় স্তম্ভ, সেগুলোর তিনজোড়ার পেছনে রয়েছে একটি করে দরজা, সেদিক দিয়েই বোধহয় মঞ্চে পৌঁছাত প্রদর্শনীর কুশীলবেরা। বাকি চার জোড়া স্তম্ভের পেছনে চারটা করে অলিন্দ মঞ্চের মেঝে থেকে খানেকটা ওপরে ওঠানো, ল্যাটিন ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘স্কায়নাই ফ্রন,’ যার অর্থ ‘মঞ্চের সামনে,’ যদিও এগুলোর অবস্থান মঞ্চের পেছনভাগে। ছোট মঞ্চের মতো উঁচু অলিন্দগুলোতে বসানো হতো কোনো দেবদেবীর মূর্তি, আর দেয়ালে খোদিত ছিল নানান শ্লোক। গ্রিক প্রভাব থাকলেও রোমানরা স্থপতিরা থিয়েটারে যুক্ত করেছে তাদের নিজস্ব শৈলি, যেমন ‘স্কায়নাই ফ্রন। হাইরাপোলিস জাদুঘরে রাখা আছে এসব খোদাই কর্মের মূল খণ্ডের কিছু নিদর্শন। থিয়েটারের মঞ্চ সংস্কারের সময় আদি কাঠামোর সঙ্গে বসানো হয়েছে নতুন রেপ্লিকা। পরবর্তী সময়ে নানান পর্যায়ে সংস্কার করে স্তম্ভ ও খিলান থেকে মুছে ফেলা হয়েছে বয়স ও ধ্বংসের চিহ্ন। এই সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের সময় ইতালীয় ও তুর্কি প্রত্মতত্ত্ববিদেরা যথেষ্ট মেহনত করে উদ্ধার করে শনাক্ত করেছেন প্রায় তিন হাজার পাথরের ব্লক। জিগ স পাজলের মতো সাজাতে গিয়ে যে অংশগুলো উদ্ধার করা যায়নি, তৈরি করা হয়েছে সেগুলোর নকল। তারপর সব একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে মূল থিয়েটারের আগের চেহারা। মূল মঞ্চের এই চেহারা ফিরিয়ে আনা হয়েছে মাত্র সেদিন, ১৯৭৭ সালে। পুরনো ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, মঞ্চের নিচে ধনুকের মতো বাঁকানো বীমের নিচ দিয়ে ছিল অর্কেস্ট্রাতে আসা যাওয়ার পথ।
হাইরাপোলিসে চূড়ান্ত ধ্বংস ডেকে আনে ১৩৫৪ সালের ভূমিকম্প। এবারে বিধ্বস্ত টিকে থাকা ভবন ও স্থাপনাগুলো ভেঙে পড়ে। পুরো এলাকা ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে যায় চুনাপাথরের আস্তরণের নিচে। প্রায় চারশ বছর এভাবেই পড়ে ছিল হাজার বছর আগের এই নগরী। জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ কার্ল হুমান প্রথমবারের মতো (১৮৮৭) জরিপ ও খননকাজ চালিয়ে ধ্বংসাবশেষ থেকে তুলে আনেন বহু মূল্যবান নিদর্শন। পরবর্তী পর্যায়ে (১৯৫৭) ইতালীয় প্রত্নতাত্ত্বিক মিশন আরেক দফা খননকাজ চালিয়ে মাটির নীচ থেকে উদ্ধার করে এক উন্নত শহরের ধ্বংসাবশেষ। এসময় জানা যায় আধুনিক ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন এই নগরীর অধিবাসীরা। এখান থেকে পাওয়া যায় তখনকার যুগের তুলনায় সমৃদ্ধ এক মানব বসতির সন্ধান। সেখানে ছিল ঠান্ডা ও গরম জলের হামাম, লাইব্রেরি, জিমনেশিয়াম, অ্যাম্ফিথিয়েটার ও ন্যাক্রোপলিস তথা গোরস্থান। সর্বশেষ (২০১১) অনুসন্ধানের পর আরেক ইতালীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ ফ্রান্সেসকো দান্দ্রেয়ার নেতৃত্বে আরো নতুন খননের পাশাপাশি পুনরুদ্ধারের কাজও করা হয়। এখন পর্যন্ত আন্তালিয়াতে গ্রিক—রোমান থিয়েটারের সবচাইতে ভালো সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে গন্য করা হয় এটাকে।
অ্যাম্ফিথিয়েটার থেকে নেমে আসার পর কিছুটা দূরে হাতের ডানে রয়েছে নেক্রোপলিস। গ্রিক ভাষার এই শব্দটির বাংলা অর্থ ‘মৃতের শহর,’ অর্থাৎ সমাধিভূমি। প্রায় দুই কিলোমিটার জায়গা জুড়ে হাইরাপোলিসের গোরস্থানটিতে রয়েছে প্রায় বারোশ কবর। এসব সমাধির কোনোটির বয়স দুই হাজার বছরেরও বেশি। কেবল স্থানীয় মানুষেরই নয়, এখানে চিকিৎসা নিতে আসা অসুস্থ এবং কেবল এই পবিত্র নগরীতে সমাহিত হতে আসা মৃত্যুপথযাত্রীদের সমাধিও রয়েছে এখানে। অনেক কবরে খোদিত রয়েছে কবরচোরদের জন্য অভিশাপ। কারণ, শবদেহের সঙ্গে দেওয়া মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করার জন্য কবর খুঁড়ত এই তস্করেরা। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। এসব কবরের কোনোটিই চোরদের হাত থেকে নিস্তার পায়নি। স্বচ্ছল মানুষদের কবরের পাথরের কফিন পড়ে আছে আদ্যিকালের সিন্দুকের মতো, কোনোটির গায়ের খোদাই নকশা এখনো দৃশ্যমান। এগুলোর কোনোটি মাটির ওপর, আবার কোনোটি অর্ধেক মাটিতে পেঁাতা। কোনোটি আবার পাথরের উঁচু মঞ্চের ওপর ওঠানো। আরো পয়সাওয়ালাদের কবরকে সামান্য কবর বলা যায় না, এগুলো একদরজার ছোটখাটো দোচালা পাথরের ঘর।
নেক্রোপলিসের ঢাল থেকে কিছুদূর নামলে সেন্ট ফিলিপের সমাধির চতুষ্কোণ স্তম্ভের বাঁকানো খিলানের নিচে একটা অলিন্দ। তবে, সাম্প্রতিক (২০১১) খননে জানা গেছে, আদি সমাধিটা আরো খানিকটা দূরে। ফিলিপের দেহাবশেষও নেই সেখানে।
এরকম কড়া রোদের মধ্যে হাইরাপোলিসের সম্পূর্ণ অংশ পায়ে হেঁটে একবেলার মধ্যে দেখে শেষ করা সম্ভব নয়। তারচেয়ে বরং জাদুঘরে ঢুকে বাছা বাছা কিছু ভাস্কর্য নিদর্শন দেখা ভালো। জাদুঘর ভবনটা নিজেই একটা জাদুঘরে রাখার মতো নিদর্শন। প্রাচীন এক রোমান হামামকেই বানানো হয়েছে জাদুঘর। খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীর এই হামামখানা ছিল শরীরচর্চা, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও সামাজিক মেলামেশার জায়গা। বিশাল উঁচু ছাদের ঘরটিতে ঢোকার পর চারপাশে ছড়ানো নিদর্শনগুলো থেকে যেন ঠিকরে পড়ছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন এবং শৈল্পিক আভা। কারুকার্যখচিত পাথরের কফিন, দেবতা আর সম্রাটদের মূর্তি, দেয়ালে, স্তম্ভে আর খিলানের ওপর খোদাই করা কারুকাজের রিলিফকর্মগুলোতে দৃশ্যমান প্রাচীন যুগের ভাস্কর্যশিল্পীদের কারুনৈপুণ্য। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর ছোট চমৎকার একটা মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে গ্রিক পুরাণের দেবতা শিশু জিউসকে দুধ খাওয়াচ্ছেন তাঁর পালিত মা অ্যামালথিয়া, যাকে ছাগল হিসেবে দেখানো হয়। পুরাণ মতে এই অ্যামালথিয়া জিউসকে রক্ষা করেছিলেন তাঁর সন্তানখেকো বাবা ক্রোনোসের হাত থেকে। অ্যামালথিয়ার দুধ খেয়েই শক্ত সবল হয়ে উঠেছিলেন জিউস। জাদুঘরের পাথরের কফিনগুলো যেন এক অপার বিস্ময়। এসব কফিনের বাইরের গায়ে খোদাই করা অবিশ্বাস্য নিখুঁত ভাস্কর্যগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে ভাস্করের জাদুময় হাতে। এসব ছাড়াও প্রাচীন মিসরের দেবী আইসিসের এক ধর্মযাজিকা, গ্রিক দেবতা হেডিসের ভাস্কর্য, রোমান সম্রাট সেপ্টিমিয়াস সেভেরাসের অভিষেক, অ্যাপোলোর জন্ম—এসব অক্ষত ভাস্কর্যের সবগুলোই উদ্ধার করা হয়েছে হাইরাপোলিসের বিভিন্ন ধ্বংসস্তুপ থেকে।
হাইরাপোলিস নগরীর ঘুরে এসে জাদুঘর দেখার শেষে পশ্চিম দিকে এগোলে এতক্ষণ দেখা ধ্বংসস্তুপের ঠিক বিপরীত এক মায়াবী দৃশ্য চোখে পড়ে। বরফসাদা তল ও প্রান্তদেশ নিয়ে একাধিক ধাপের নীলচে জলাধার নিয়ে পামুক্কালে যেন অপেক্ষা করে ভ্রমণক্লান্ত মানুষের জন্য শীতল প্রশান্তি নিয়ে। তুর্কি ভাষায় পামুক্কালের অর্থ তুলোর প্রাসাদ। তবে তুলার প্রাসাদের চাইতে বেশি মনে হয় বরফের প্রাসাদ।
কয়েক হাজার বছর আগে একাধিক ভূমিকম্পের কারণে মাটিতে তৈরি হয়েছিল অনেক ফাটল। সেই ফাটল দিয়ে বের হতে থাকে মাটির নিচের ক্যালসিয়াম কার্বনেট যুক্ত গরম জল। এই ক্যালসিয়াম কার্বনেট হচ্ছে চুনাপাথর ও খনিজ লবণ। সেই পানি ওপরে জমা হতে থাকলে নিজস্ব উষ্ণতা ও সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, থেকে যায় চুনাপাথর ও খনিজ লবণ, যা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে পাথরের মতো হয়ে গিয়ে তৈরি করেছে ছোট বড় অনেকগুলো জলাধার। উঁচু পাহাড়ের ঢালে এভাবে ধাপে ধাপে তৈরি জলাধারের কোনোটির আকৃতি বিশাল আমাজন লিলির পাতার মতো, কোনোটি ঝিনুকের মতো।
খনিজ লবণ সমৃদ্ধ এই জলে রোগ নিরাময় হয়, এই বিশ্বাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানান বয়সী মানুষ ভিড় জমাতো এখানে। তাই গ্রিক শাসনামল থেকে এই উষ্ণ জলাধার যেমন ছিল নিরাময় কেন্দ্র, একই সঙ্গে হাইরাপোলিসের ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে এই উষ্ণ জলকে মানুষ গ্রহণ করেছিল দেবতার দান হিসেবে। ফলে এই জলের খনিজ বৈশিষ্ট্য ঢাকা পড়ে গিয়েছিল এটির অলৌকিক নিরাময় ক্ষমতার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম বিশ্বাসের নিচে।
নীলচে জলের প্রান্তে এসে জুতো খুলে রেখে নারী পুরুষ ও শিশুরা নেমে যায় গোড়ালি ডোবা পানিতে। পরের ধাপে আরো গভীর জলে নামে আরো সাহসীরা। সেখানে শরীর ডুবিয়ে বসে থাকে। সেই ধাপের পর নিচে নামলে আরো গভীর জল। সেখানে না যাওয়ার জন্য সতর্কবাণী সাঁটা সাইনপোস্ট উপেক্ষা করেও নামে কেউ কেউ। দুই প্রস্থ সুইমিং পোশাক পরা বিগতযৌবনা নারীরা জল থেকে উঠে এসে পাড়ে বসে বিকেলের রোদ পোহায়। তাদের সফেদ ত্বক থেকে উজ্জ্বলতর হয় বিচ্ছুরিত শেষ বেলার আলো। বহুদূরে নীচে কালচে সবুজ পাইন বন, ইতস্তত ছড়ানো ঘরবাড়ির ওপর ততক্ষণে নেমে এসেছে শেষ বিকেলের ম্লান ছায়া। আরো বহুদূরে দিগন্ত আড়াল করে দাঁড়ানো পাহাড় তখন আবছা কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে।
ছবিতে হাইরাপোলিস
এক স্মরণীয় ভ্রমণের ফ্রেমবন্দী মুহূর্তগুলো

অ্যাম্ফিথিয়েটার

জিমনেশিয়ামের ধ্বংসাবশেষ

হাইরাপোলিসের প্রাচীন সমাধিগৃহ

প্রাচীন সমাধিমন্দির

জাদুঘরে রক্ষিত শবাধার

হাইরাপোলিসের জাদুঘরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

অ্যাপলো মন্দির ও প্লুটোনিয়ামের ধ্বংসাবশেষ

হাইরাপোলিসের পামবীথি

হাইরাপোলিস জাদুঘরের প্রবেশদ্বার

পামুক্কালের খনিজ জলাধার

জাদুঘরে দেবী আইসিসের ভাস্কর্য

প্লুটোনিয়ামের ডিজিটাল ছবি