A BILINGUAL ONLINE LITERARY MAGAZINE

কুদুম গুহা

হোয়াইকং হতে শামলাপুর রোডে ১৫ মিনিট গেলে পর একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নামতে হয়। এরপরই বন্য প্রানীর অভয়ারন্যের মধ্য দিয়ে ট্রেইল, ট্রেইল ধরে ১০/১৫ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায় কুদুম গুহাতে।


এখানে বন বিভাগের একটা বিট অফিস আছে, বিটে যোগাযোগ করে নেয়া ভালো। রাস্তাটার দুর্নাম আছে, দিনে দুপুরেও ডাকাতি হয়। ঝুঁকি না নিতে চাইলে, সাথে নারী সদস্য থাকলে হোয়াইকংয়ের হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পুলিশ নেয়া যেতে পারে।


গুহার প্রবেশ মুখ প্রায় ১৫ ফুট উঁচু, ভেতরে ছাদের অংশ বেশ প্রশস্ত, দেয়াল বেয়ে চুঁইয়ে পানি ঝরছে অবিরত। যার দরুন সারা বছরই পানি থাকে এর ভেতর। প্রবেশ পথে হাঁটুপানি, ভিতরে যাওয়ার সাথে সাথে পানির গভীরতা শুধু বাড়বে। ভেতরে এতোটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন যে জোরালো আলো ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। গুহার ভেতরে রয়েছে প্রচুর বাঁদুড় আর চামচিকা। রয়েছে বিরল প্রজাতির ছোটো আকারের প্রভাতি নামক বাঁদুর। বাঁদুড়ের উড়োউড়ি, অবিরাম কিচকিচানি আর বোঁটকা গন্ধ। বাঁদুড় আর চামচিকা যেখানে থাকবে, সেখানেই সাপ, বিশেষত অজগরের উপস্থিতি স্বাভাবিক।স্থানীয় লোকদের মতে এখানে কিছু ছোট অজগর আছে। গুহার স্বচ্ছ পানিতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় মাছ ও নানান রকমের ব্যাঙসহ গুগলি আর শামুক।


আমরা গিয়েছিলাম মোট ১৮ জনের দল, শামলাপুর হতে অটোতে চড়ে। একটা অটোতে তিনজন, আমাদের অটোতে কে যেন বাঁশের মাথায় টাঙ্গানো পতাকাটা বেধে দিয়েছিলো, বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম, যেন সত্যিই কিছু জয়ের লক্ষে চলেছি আমরা।


টেকনাফ হতে কক্সবাজার পর্যন্ত সমূদ্রের পাড় ধরে পায়ে হেটে অতিক্রম করার যে এক দুর্দান্ত অর্জন তারই ১৮ জনের আর এক প্রবল ইচ্ছা এ কুদুম গুহা দেখার। বীচ হাইকিংয়ের দ্বিতীয় দিনে আমরা কচ্ছপিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্যাম্প থেকে সবার আগে বের হয়ে এলাম বেলা দুইটার মধ্যেই যাতে করে শামলাপুর পৌছুতে পারি, নইলে কুদুম গুহা দেখতে যাওয়া যাবে না। উত্তেজনায় নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই শামলাপুর পৌছায় সকলে।


অটোতে দশ/পনের মিনিটের পথ, পথটা নির্জন, ডাকাতি হওয়াটা অস্বাভাবিক না। তবে ডাকাতের ভয়ের চেয়ে নির্জনতাটাই বেশী উপভোগ্য ছিলো আমার কাছে। মিনিট দশেক চলার পরই মূল রাস্তা ছেড়ে অটো পাশের বনের ভেতরে মোড় নিলো। তার কিছু পরেই পায়ে হাঁটা পথ। বনের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো বন্যপ্রানীর অভয়ারন্যের নানা সাইনবোর্ড, বেশ একটা গা ছমছমে ভাব। সরকারি মাশুল দিয়েই বনে ঢুকতে হয়। ট্রেইল ধরে চলাচলে সুবিধার জন্য সরকারি কিছু উদ্যোগ চোখে পড়লো। রাস্তার পাশেই হাতির বিষ্ঠা দেখে বোঝা যায়, এলাকাতে বন্য হাতির আনাগোনা আছে।


পায়ে হাঁটা পথটাও দশ/পনের মিনিটের বেশী হবে না, নির্জন পাহাড়ী এলাকা, দুর্গম বলতে রাজী নই মোটেই। অবশ্যই মসৃন কোন পথ নয় এটা তবে পাহাড়ের চড়াই উৎরাই বলতে কিছুই নেই। মোটামুটি সমতল রাস্তায় কাদা এড়িয়ে ছোটখাট নালা পাড় হয়ে ভালোভাবেই পৌছুলাম কুদুম গুহার সামনে, বর্ষায় এলে জোঁকের একটা আতংক থাকতেই পারতো।


প্রাকৃতিক গুহা বলে মনে হয়নি এটাকে, মানুষের বানানো। মাটি কেটে করা হয়েছে তার চিহ্ন পরিস্কার। গুহার সামনে এলেই একটা বোঁটকা গন্ধে মুখটা বাঁকা হয়ে গেল, বুঝলাম বাদুর চামচিকায় ভরা। গুহার ভেতরে আমাদের ১৮ জনের চিৎকার চেচামেচিতে অতিষ্ট হয়ে সবাইকে উড়ে বের হয়ে আসতে হয়েছিলো এক পর্যায়ে।


আমাদের গাইডের মতে পর্যটকের চাপে গুহার মাটি দেবে গেছে যে কারনে পানি এখন অনেক বেশী, আগে এত পানি ছিলো না এখানে, দলের প্রায় সকলকেই সাঁতার কাটতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধাস্ত্র রাখার জন্য বৃটিশদের বানানো। গাইডের মন্তব্য আমার কাছে গ্রহনযোগ্য মনে হলো কারন, টেকনাফের কাছে পাহাড়ের মাথায় আর একটা গুহা দেখেছিলাম যেখানে একটা কামান রাখা ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টেকনাফের সাগর পাড়টাকে নাগালের ভেতর রাখার জন্য।

ছবিতে কুদুম গুহা






২৬ ডিসেম্বর ২০১৯

Share on social media