চীন দেশে প্রস্তরের বনভূমি
জুলাই মাস চীন দেশে যাবার জন্যে মোটেও ভালো সময় নয়। প্রচণ্ড গরম এবং মাঝে মধ্যেই তুমুল বৃষ্টি। কিন্তু তারপরেও আমরা ঢাকা থেকে জুনের ত্রিশ তারিখে পৌঁছলাম কুনমিং। এর প্রধান কারণ ছিল সেই সময় একটা এয়ারলাইন্সের 'অফার' চলছিল। যারা নিয়মিত এদিক সেদিক উড়ে যান, তাঁরা বিলক্ষণ জানেন এই প্রাইস ড্রপ বা অফার তাঁদের জন্যে কতোটা আনন্দের সংবাদ!
আমরা এগারোজন যখন কুনমিংএ পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ইমিগ্রেশনের কর্তাদের বাড়ি যাবার তাড়া ছিল কিনা জানি না, তারা প্রায় কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করে আমাদের পাসপোর্টে দ্রুত এক নজর চোখ বুলিয়ে ছেড়ে দিল।
হোটেল খুনমিং হাইতাং-এ পৌঁছে চেক-ইন এর পরপরই ফ্লাওয়ার মার্কেটে যাবার কথা ছিল। কিন্তু সন্ধ্যা ক্রমেই রাতের দিকে গড়িয়ে গেলে হোটেলের বিছানায় খানিকক্ষণ গড়াগড়ি করে আশে পাশে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের হোটেলের সামনের জলাধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে রঙিন মাছের ঝাঁক। অভ্যন্তরে রিসেপশানে দায়িত্বে থাকা তরুণ তরুণীরা বেশ স্মার্ট। তবে তাদের ইংরেজি যথেষ্ট ভালো হলেও ম্যান্ডারিন বলে ভুল হতে পারে। প্রথমে বুঝতে কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে নিজের কানকে অভ্যস্ত করে ফেলতে পারলে মনে হবে এটাই তো চাইনিজ ইংরেজি। হোটেলের রুমগুলো বেশ প্রশস্ত, ঝকঝকে বাথরুম এবং বিছানা বালিশ থেকে শুরু করে কোনো কিছুতে খুঁত ধরার তেমন সুযোগ ছিলনা। ঘরের জানালায় দাঁড়ালেই বাইরে দেখা যায় রাতের কুনমিং!
পরদিন সকালে কুনমিং হাইতাং-এর ব্রেকফাস্ট বেশ ভালো ছিল, কিন্তু আমাদের আয়েশ করে নাস্তা খাবার সময় ছিল না। নির্ধারিত গাইড সাড়ে সাতটায় তার বাহনসহ এসে হাজির। অতএব ব্রেকফাস্ট পবর্ শেষ করেই উঠে পড়তে হলো গাড়িতে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে একজন ট্যুর গাইড ছাড়া ঘুরে ফিরে বেড়ানো সম্ভব হলেও চীন বা কোরিয়ার মতো দেশে সেটা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়।
কুনমিংএ আমাদের গাইডের নাম কী ছিল! ওয়াং নাকি ঝাং? নামের উচ্চারণ বুঝতে পারা বেশ কঠিন, ফলে মনে রাখা নিঃসন্দেহে আরো কঠিন! তবে নাম কঠিন হলেও ছেলেটি ছিল চমৎকার। সহজ সরল টাইপ। গাড়ি চলতে শুরু করলে নিজের পরিচয় দিয়ে মোটামুটি বোধগম্য ইংরেজিতে তথ্য উপাত্তসহ সে আমাদের গন্তব্যের পরিচয় তুলে ধরেছে। তার কথা থেকে বোঝা গেল, ইউনান প্রদেশের ইতিহাস ভুগোলের সবগুলো চ্যাপ্টার সে ভালোভাবেই আত্মস্থ করেছে। বিশ্বখ্যাত ষ্টোন ফরেষ্ট সম্পর্কে বহুবার শোনা এবং কিছুটা পড়াশোনা থাকলেও গাইডের ধারা বিবরণীতে পাথরের অরণ্য পর্যন্ত পৌঁছবার আগেই নতুন করে জানা হলো। আমার মনে হচ্ছিল পরীক্ষার আগের রাতে থিওরি পড়ে প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা দিতে যাওয়ার মতো। তবে ঝ্যাং-এর উপস্থাপনার গুণে পাথুরে বনভূমি ক্রমশই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল আমাদের চোখে।
চীনের ইউনান প্রদেশের কেন্দ্র কুনমিং শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এক বিস্ময়কর ভূ প্রকৃতিক দৃশ্য- পাথরের গড়ে ওঠা এক নিঃশব্দ প্রাচীন বনরাজি। আকাশ ছোঁয়া ধারালো শিলাস্তম্ভগুলোকে দূর থেকে দেখতে মনে হয় যেন মাটিতে গজিয়ে ওঠা পাথরের গাছ; প্রকৃতি যেন তার ক্যানভাসে একরকম অদ্ভুত, রহস্যময় শিল্প এঁকেছে। এই পাথরের অরণ্য শুধু প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, এটি বহন করে এক গভীর লোককাহিনির গল্প। স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী ই সানি সম্প্রদায়ের মতে, এক কালে আশিমা নামে এক সুন্দরী সানি কন্যা ছিলেন। তার অসাধারণ রূপ, মিষ্টি কণ্ঠ এবং তুমুল সাহসিকতার কথা সবার মুখে মুখে ফিরত। সেই আশিমার প্রেমে পড়ে এক গরীব রাখাল যুবক। কিন্তু রূপকথার গল্পে যেমনটা হয়, এক ধনী সামন্তপ্রভু আশিমাকে জোর করে বিয়ে করতে চায়। আশিমা পালিয়ে যায় তার প্রেমিকের সঙ্গে। জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনি তাদের ধাওয়া করে। ঠিক সেই সময় ধেয়ে আসে এক ভয়ংকর বন্যা। বন্যার জলস্রোতে ভেসে যায় আসিমা এবং তার প্রেমিক তরুণ। ভাসতে ভাসতে এই ইউনান প্রদেশে এসে পাথরে রূপান্তরিত জুটি প্রকৃতির অংশ হয়ে এখানে থেকে গেছে।
আশিমার গল্প শেষ হবার আগেই আমরা ষ্টোন ফরেষ্টের প্রবেশ পথে এসে দাঁড়ালাম। ঝ্যাং-এর তথ্য বিবরণী শুনতে শুনতে এবং দুপাশের সবুজ প্রকৃতি দেখতে দেখতে বুঝতেই পারিনি, কেটে গেছে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক সময়। প্রবেশপত্র সংগ্রহ করে ভেতরে প্রবেশের পর ঝ্যাং-প্রথমেই আমাদের নিয়ে এলো প্রক্ষালন কক্ষে। টয়লেট, বাথরুম, ওয়াশরুম, ডাবলু সি, রেস্টরুম নামে এশিয়া, ইওরোপ, আফ্রিকার অনেক দেশেই প্রক্ষালণ কক্ষ ব্যবহারের সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য হয়েছে। সত্যি অস্বীকার করার উপায় নেই। চীনের ষ্টোন ফরেস্ট-এর প্রক্ষালন কক্ষে যে মুগ্ধতার শুরু হয়েছিল, চীনের প্রায় সকল শহরে, সবগুলো টুরিস্টস্পটে একই ধরনের পরিচ্ছন্নতা এবং ব্যবস্থাপনা লক্ষ করেছি।
আমাদের বাহন প্রবেশ দ্বারের বাইরে থেকে গিয়েছিল। ভেতরে ট্যুরিস্ট পরিবহনের জন্য খেলনা গাড়ির মতো ছোট ছোট বিদ্যুত চালিত গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো পাথর বনভূমির একবারে মূল প্রবেশ পথের সেতুর মুখে। একটা ছোট্ট নদী পেরিয়ে ওপারে যেতে হবে। সেতু পেরিয়ে ওপারে যাবার পরে সবুজ পাতা আর রঙিন ফুলের সমারোহ। দূরে যে দিকেই তাকাই চোখে পড়ে নানা দৈর্ঘ্য এবং বিভিন্ন আকার আকৃতির পাথুরে গাছ। আমরা পুষ্প পাতার সাজানো উদ্যান থেকে হাঁটতে হাঁটতে ক্রমেই এগিয়ে চললাম মূল পাথুরে বনের পথে। এই অরণ্য বৃক্ষের নয়, পুঞ্জীভূত প্রস্তরের। প্রকৃতি এখানে এক বিস্ময়কর স্থপতি। দাঁড়িয়ে থাকা পাথর গাছের কেউ খাড়া, কেউ হেলানো, আবার কোথাও একাধিক গাছ জড়িয়ে আছে পরস্পরের সাথে। এক ঝলক দেখে নিলেই মনে হয় যেন শত শত পাথরের গাছ, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কোন এক অদ্ভুত, নীরব প্রতিবাদে।
ধীরে ধীরে প্রবেশ করলাম ‘গ্রেট স্টোন ফরেস্ট’-এর ভেতরে। হালকা রোদের আলো অলৌকিক পর্দার মতো গাছে গাছে ছড়িয়ে আছে। পায়ে পায়ে আমাদের পথ এগোয়, যতই সামনে যাই, শিলাবৃক্ষ একইভাবে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। একেকটি পাথর যেন একেকটি চরিত্র। কারও মুখে বিষাদের রেখা, কেউ আনন্দে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আর কারও গায়ে যুদ্ধের ক্ষত চিহ্ন। আমরা অবাক হয়েছি এইসব বৃক্ষের সুনিপুন বিন্যাস দেখে। না, এই সাজানো বাগান, পাথুরে গাছের এই সুচারু বিন্যাস প্রাকৃতিক নয়। ঠিক যেমন করে কোনো বোটানিক্যাল গার্ডেনে গাছপালা বা ফুলের কেয়ারি সাজানো হয়, ইট বা পাথরের বেষ্টনী তৈরি করা হয়, গাছের গোড়ায় সাজিয়ে রাখা হয় পাথরের টুকরো, তেমনি করে অরণ্যের এক বা একাধিক প্রস্তর বৃক্ষকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কোথাও একটি দীর্ঘ সারির প্রতিফলন দেখতে পাই লেকের জলে, আবার কোথাও স্তরে স্তরে সাজানো শিলার ধাপ চলে গেছে অনেক দূরে, পৌঁছে গেছে অনেক উচ্চতায়।
আমাদের গাইড ঝ্যাং এগিয়ে এসে বলল, “ওই যে দেখুন, ওটাই সেই ‘আশিমার পাথর’। সানি সম্প্রদায়ের যে সাহসিনী কন্যা প্রেমের জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। তার দেহ পাথরে রূপান্তরিত হয়েছে। এখনও তিনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন, প্রেমের চিরন্তন রূপ হয়ে।”
আমরা প্রায় সকলেই আশিমার দিকে তাকালাম। সত্যিই, পাথরটার গড়ন অনেকটা এক নারী মূর্তির মতো। এক হাতে চুল সরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন। বাতাসে নড়ছে না কিছুই, কিন্তু তার আশপাশে যেনো এক অব্যক্ত সুর বাজছে। দলের প্রত্যেকেই প্রায় প্রতিটা প্রস্তর খণ্ডের সাথে ছবি তুলতে চায়। ফলে গতি শ্লথ হয়ে যায় বারবার। আরো খানিটা এগোতে দেখি রূপের বৈচিত্র্য। কোথাও সুচালো শিলাস্তম্ভ-যেন তলোয়ার উঁচিয়ে আকাশ ছুঁতে চায়। কোথাও তারা জট পাকানো চুলের মতো-অথবা ঘন গোলকধাঁধা। একটা জায়গায় মনে হলো বিশাল কোনো শিলা বসে আছে মাথা নিচু করে-কোনো প্রাচীন ঋষির মতো। আলো পড়লে এসব পাথরের ছায়া বিশাল হয়ে ওঠে, একেকটি যেন নিজের গল্প বলার চেষ্টা করে।
হঠাৎ দূরে শোনা গেল বাঁশির সুর। আরো খানিকটা এগোতে একটা ঝলমলে রঙিন দৃশ্য চোখে পড়ে। ঝ্যাং জানালো অশিমার সেই লোক কাহিনির সূত্র ধরে প্রতি বছর জুন অথবা জুলাই মাসে এখানে উৎসব আয়োজিত হয়, দূরে যা দেখতে পাচ্ছো তা এই টর্চ ফেস্টিভ্যাল বা মশাল উৎসবের অংশ। আমি বললাম, 'তাহলে আমরা নিশ্চয়ই পর্যটক হিসাবে ভাগ্যবান, তা না হলে বছরের এই সময় আমরা এখানে আসবো কেন!' ঝ্যাং একটু রহস্যের হাসি হেসে বললো, বছরের নির্ধারিত জুন-জুলাই বা অগাস্ট মানে উৎসব হলেও অনেক আগে থেকেই এর প্রস্তুতি চলে। আর তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি, এখন পর্যটকদের জন্য প্রতিদিনই এখানে চলে মশাল উৎসব!'
কাছাকাছি এগিয়ে দেখা গেল পাথরের বনের মাঝেই এখটা খোলা জায়গায় জমজমাট মেলা। স্থানীয় তরুণীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কেউ কেউ শিলার গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ বা পর্যটকদের সাথে হাসিমুখে ছবি তুলছে। কেউ কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে নাচের ছন্দ তুলে। আমাদের প্রায় সকলেই একেকজন সুন্দরীকে পাকড়াও করে ছবি তুলতে শুরু করে দিল। এই আয়োজনে আনন্দ আর একটা নিঃশব্দ প্রত্নভুমিতে কেউই বিস্মৃত হতে চায় না। আমার হাতে ক্যামেরা থাকায় আমি প্রয়াই ছবি থেকে বাদ পড়ে যাই। তারপরেও কোনো একজনের হাতে ক্যামেরা দিয়ে একটু চেষ্টা করেছিলাম ছবি হয়ে থাকতে। কিন্তু দেখা গেল বেশিরভাগ সময়েই ফ্রেমের ভেতরে কেউ না কেউ ঢ়ুকে পড়েছে। অগত্যা সুন্দরী সানি কন্যার সাথে ছবি তোলার আশা বাদ দিয়ে এবড়ো থেবড়ো প্রস্তর বৃক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে এবং মসৃণ পাথর খণ্ডে বসে কয়েকটা ছবি তুলে মেলায় চক্কর দিতে চলে গেলাম।
স্থানীয় কারুশিল্পীরা মেলায় তাদের হাতে তৈরি নানা ধরনের পণ্যের পশরা সাজিয়ে বসেছে। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলাম, কিন্তু যতো আকর্ষণীয় বা লোভনীয় হোক প্রথম দিনেই স্যুভেনিয়ার কিনে বোঝা না বাড়াবার ব্যাপারে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অতএব কোনো কিছু না কিনে ঝ্যাংএর পেছনে পেছনে হেঁটে চললাম সেই ব্যাটারি চালিত নিঃশব্দ বাহনের দিকে। এবারের গন্তব্য সাড়ে সাত কিলোমিটার দূরে নাইগু স্টোন ফরেস্টে।
ছবি মালা





