A BILINGUAL ONLINE LITERARY MAGAZINE

সিডনির স্মৃতিগুলো

মহাদেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার নাম শুনলেও দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়াকে খুব একটা জানতাম না। স্কুলের ভূগোল বই থেকে দেশ-মহাদেশ সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, আমার জ্ঞানও ছিল ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনীতি ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চা করতে গিয়েই অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা জানার সুযোগ হয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র বিদেশি বীর প্রতীকপ্রাপ্ত যোদ্ধা ডব্লিউ. এ. এস. ওডারল্যান্ড একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক—এ তথ্যও অস্ট্রেলিয়ার প্রতি আমার আগ্রহের অন্যতম কারণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় পুঁজিবাদী বিশ্বের যেসব দেশ ও তাদের জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়া তাদের অন্যতম। অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রিসভা ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে এবং ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়াই ছিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম রাষ্ট্র।

মানচিত্রে ছবি দেখে সন্তুষ্ট থাকা ছাড়া দেশটি ভ্রমণের সামর্থ্য কখনোই ছিল না। আমাদের ছেলে শাশ্বত গৌরব সিদ্ধার্থের কারণেই সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে সে কয়েক দিনের জন্য তার মা ও আমাকে সিডনিতে নিয়ে আসে। সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফর। সন্তান অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার সুবাদে এরপর আরও কয়েকবার সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের একটি মন্তব্য দিয়ে অনেকগুলো ভ্রমণ থেকে গুটিকয়েকটি স্মৃতির উল্লেখ করতে চাই।

একটি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি সিডনিতে এসেছিলেন। সম্মেলনের আয়োজকদের মধ্যে ছিলেন প্রশান্তিকার আতিকুর রহমান শুভ, তাঁর ছোট ভাই উপন্যাসিক আরিফুর রহমান এবং প্রবাসী বাঙালি সমাজের বটবৃক্ষখ্যাত গামা আব্দুল কাদির। সাহিত্যসন্ধ্যার ফাঁকে একদিন তিনি আমার ছেলেকে ডেকে নানা পরামর্শ দেন। পরে ছেলের ফোনে আমার সঙ্গেও কথা বলেন।

কথা প্রসঙ্গে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘অস্ট্রেলিয়া কেমন লাগছে?’

তিনি অকপটে বললেন, ‘না, আমার ভালো লাগছে না।’

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘কী বলেন! এত সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ও ঝকঝকে একটি দেশ—আপনার ভালো লাগছে না?’

মনে মনে ভাবলাম, তিনি তো লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস ঘোরা মানুষ; হয়তো তুলনা করেই এমন বলছেন।

কিন্তু পরক্ষণেই তিনি ব্যাখ্যা দিলেন, ‘দেখো ভাই, একটা দেশ যদি সারাক্ষণ পাঁচতারা হোটেল কিংবা রিসোর্টের মতো লাগে, তাহলে কি আর ভালো লাগে? নোংরা করার স্বাধীনতা নেই, ফুটপাতে চা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। রাস্তায় জটলা নেই, হইহুল্লোড় নেই। বাঙালি তো একটু নোংরা করবে, রাস্তায় আড্ডা দেবে। এগুলোই যদি না থাকে, তাহলে ভালো লাগবে কী করে?’

তাঁর কথা শুনে মনে হলো, সত্যিই তো—এত ঝকঝকে, তকতকে পরিবেশে আমরা যেন অভ্যস্ত নই।


অস্ট্রেলিয়ায় না এলে বুঝতেই পারতাম না, আইন মানতে হলে তার দাড়ি, কমা, সেমিকোলন—সবকিছুই মানতে হয়। সামান্য ব্যত্যয় ঘটলেই বিপদ; গুনতে হয় মোটা অঙ্কের জরিমানা। তাই যাপিত জীবনের প্রয়োজনে এখানকার বাঙালিরাও আইন মেনে চলতে বাধ্য। দেশে আইন ভাঙায় অভ্যস্ত অনেক মানুষও এখানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিয়ম মেনে চলেন। বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর।

১২ ডিসেম্বর ২০২২ বিমানবন্দর থেকে রাত আটটার দিকে আমাদের নিতে এসেছিল সিদ্ধার্থ, তার বন্ধু রওনক এবং আমাদের কুড়িগ্রামের প্রতিবেশী সুমন আনসারী। সুইটি ও সিদ্ধার্থ উঠল রওনকের গাড়িতে, আর আমি বসলাম সুমনের গাড়িতে। সেদিনই প্রথম রাতের সিডনিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। আমাদের গন্তব্য ম্যাককোয়ারি পার্ক। পথে অসংখ্য গাড়ি চললেও রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। এখানে ট্রাফিক সিগন্যালই ঠিক করে দেয় কখন গাড়ি চলবে, কখন থামবে, কোন দিকে মোড় নেবে। অযথা হর্ন বাজানোকে অসৌজন্য বলে মনে করা হয়।

সুমনের নতুন টেসলা গাড়ি। এর আগে আমেরিকায় আমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, একসময়ের দাপুটে সাংবাদিক মাহাবুবের টেসলায় চড়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের সড়ক ও মহাসড়কে ছুটে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেটিই ছিল টেসলায় আমার প্রথম যাত্রা। তেল নয়, বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলা এই গাড়ি আধুনিক প্রযুক্তির এক বিস্ময়। উন্নত ড্রাইভিং সহায়ক প্রযুক্তির কারণে এটি নিজেই অনেক পরিস্থিতিতে গতি ও দিক নিয়ন্ত্রণে চালককে সহায়তা করতে পারে। সেই প্রথম টেসলা গাড়ির সঙ্গে পরিচয়, আর একই সঙ্গে ইলন মাস্কের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দূরদর্শিতা এবং বিশ্বখ্যাত উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পও শুনেছিলাম।

সুমন দক্ষ চালক। বয়সেও তরুণ। দেশে হলে হয়তো গাড়ির গতির শেষ সীমা না দেখে ছাড়ত না। কিন্তু এখানে সে একেবারেই শান্ত। নিজের ইচ্ছেমতো গাড়ির গতি নির্ধারণ করছে না; বরং পথই যেন বলে দিচ্ছে, কতটুকু গতিতে চলতে হবে। সেই নিয়ম মেনেই সে গাড়ি চালাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের দেশের মতোই ডান-হাতি গাড়ি চলে, আর আমেরিকায় বাম-হাতি। এখানকার সড়কে গতি ও দূরত্ব নির্ধারণ করা হয় কিলোমিটারে, আর আমেরিকায় মাইলে।

প্রায় ঘণ্টাখানেকের পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম সিদ্ধার্থের ঠিকানায়। ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই সে দুটি কক্ষের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছে। বহুতল ভবনটির নাম ‘অ্যাডিলেড’। এটি এক ভারতীয় হিন্দু ভদ্রলোকের বাসা। তিনি মাসখানেকের জন্য দেশে বেড়াতে গিয়েছেন, আর সেই সময়ের জন্যই সিদ্ধার্থ বাসাটি ভাড়া নিয়েছে। বাসার হাঁড়ি-পাতিল, বিছানা, তোশক, আসবাব—সবই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি আমাকে সত্যিই বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে ভারতীয় হিন্দু পরিবারে কিছুটা সংস্কার থাকা স্বাভাবিক বলেই জানতাম। কিন্তু এখানে তার কোনো ছাপই দেখলাম না। সবকিছুসহ একটি বাসা ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি আমাদের বাস্তবতায় কল্পনাও করা যায় না। অবশ্য ভারত ও নেপালে ‘হলিডে হোম’-এর ব্যবস্থা রয়েছে, তবে সেখানে ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সবকিছু ভাড়াটিয়ার জন্য উন্মুক্ত থাকে না। বাড়ি হলেও সেগুলো অনেকটা হোটেল ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। কেবল ইচ্ছা করলে নিজেরা রান্নাবান্না করতে পারেন।

আমরা এসেছি ডিসেম্বর মাসে। আমাদের দেশে তখন শীতের প্রকোপ, আর অস্ট্রেলিয়ায় গ্রীষ্মকাল। এ সময় ইউরোপ ও আমেরিকার তীব্র শীত এড়িয়ে উষ্ণতার খোঁজে বিপুলসংখ্যক পর্যটক সিডনিতে আসেন। শহরের নানা প্রান্ত ঘুরে আমার মনে হয়েছে, সিডনি যেন মূলত সমুদ্রস্নানেরই এক শহর। সমুদ্রসৈকতগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। কোথাও কোথাও রৌদ্রস্নানের জন্য প্রায় উন্মুক্ত হয়ে সূর্যের আলোয় শরীর সঁপে দেওয়ার দৃশ্যও চোখে পড়ে। মনে হয়, মানুষ যেন ডানা মেলে রোদের উষ্ণতা আর প্রাণশক্তি সঞ্চয় করে আবার নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাবে।

সিদ্ধার্থ তার মাকে নিয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে যত বেশি সম্ভব জায়গা দেখানোর চেষ্টা করছে। একমাত্র সমস্যা, তার নিজের কোনো গাড়ি নেই; আবার গাড়ি চালানোও শেখেনি। তাই আমরা ট্রেনে করে চলে এলাম সার্কুলার কুইয়ে (ঈরৎপঁষধৎ ছঁধু)। স্টেশন থেকে বেরিয়েই চোখ আটকে গেল চারপাশের অপরূপ সৌন্দর্যে। পৃথিবীখ্যাত সিডনি অপেরা হাউস এবং হারবার ব্রিজের জন্য এলাকাটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দিনের আলোয় অপেরা হাউস ও হারবার ব্রিজের দৃশ্য দেখে সত্যিই বিমোহিত হলাম। সমুদ্রের বুকে, পাহাড়ের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা অপেরা হাউস যেন মানুষের সৃজনশীলতার এক অনন্য স্মারক।

Artwork

পিছনে অপেরা হাউস

কিছু ছবি তুলে আমরা ফেরিতে উঠলাম ম্যানলি বিচের (গধহষু ইবধপয) উদ্দেশে। প্রায় আধা ঘণ্টার জলযাত্রা। আমি একদিকে সমুদ্র, পাহাড় ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম, অন্যদিকে মা ও ছেলের নির্মল আনন্দের মুহূর্তগুলো দেখছিলাম। সেই আনন্দ যেন প্রকৃতির সৌন্দর্যকেও ছাপিয়ে যাচ্ছিল। দিনের বড় একটি অংশ কেটে গেল ম্যানলি বিচে। পরে আবার ফেরিতে করে ফিরে এলাম।

এই জলপথে সমুদ্র ও নদীর পানির রঙের পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়। সার্কুলার কুই থেকে ম্যানলি বিচ পর্যন্ত জলরাশি ধূসর-নীল আভায় ঝিলমিল করে। পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা বসতি আর পরিকল্পিত বৃক্ষরাজি মিলে এক অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। সেই মোহনীয় রূপ ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন।

সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে আমরা আবার সার্কুলার কুইয়ে ফিরে এলাম। হারবার ব্রিজ ও অপেরা হাউসকে ঘিরে থাকা রেস্তোরাঁগুলোর টেবিল ভরে গেছে মানুষে। চারদিকে রঙিন আলোর ঝলকানি। টেবিলের ওপর সারি সারি রঙিন পানীয়ভর্তি গ্লাস। ‘চিয়ার্স’ বলতে বলতে গ্লাসে গ্লাসে আলতো ঠোকাঠুকির টুংটাং শব্দ যেন আনন্দের এক স্বতন্ত্র আবহ তৈরি করছে। এখানে মানুষ একত্র হয় জীবনকে উদযাপন করতে। তাদের অনেকের কাছেই স্বর্গ-নরক কেবল ধর্মীয় কাহিনি; তারা এই পৃথিবীর জীবনকেই যতটা সম্ভব আনন্দময় ও স্বর্গসম করে তুলতে চায়। তাই তাদের এই অকৃত্রিম আনন্দ-উৎসব।

Artwork

ম্যানলি বিচ (Manly Beach)

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের রাজনৈতিক বন্ধু প্রতিমা চৌধুরীর কক্ষসঙ্গী ও সহপাঠী ছিলেন সিডনিপ্রবাসী বলাকা আপা। আমরা সিডনিতে এসেছি জেনে একদিন নিজ দায়িত্বে আমাদের নিয়ে গেলেন পাম বিচে। মনোরম পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অবকাশযাপনের জন্য সমুদ্রসৈকতটি বিশেষভাবে পরিচিত। এ এলাকার স্থায়ী ও অস্থায়ী অধিকাংশ বাসিন্দাই উচ্চবিত্ত। বলাকা আপাও তাঁদেরই একজন। অনার্সে পড়ার সময় তিনি তৌহিদ সাহেবকে বিয়ে করেছিলেন। নাবিক স্বামীর সঙ্গে জাহাজে জাহাজে পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরতে ঘুরতেই একসময় সিডনিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। নিজের বাড়িতে আন্তরিক আপ্যায়ন ও মধ্যাহ্নভোজের পর প্রায় দেড় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আমাদের বাসায় পৌঁছে দিলেন। একটি আক্ষেপ থেকেই গেল—তাঁর পতিদেবের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হলো না।


পরদিন আমার মামাতো বোন রেনু বকসী ও তার বর ড. আনোয়ারুল হক বকসী কে সঙ্গে নিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। ড. বকসী সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃষি গবেষক। তাঁরা সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সিডনিতে বসবাস করছেন। সেদিনই তাঁরা আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন লা পেরুজ (La Perouse) দর্শনে।

সমুদ্রতীরবর্তী এই ঐতিহাসিক এলাকার নামকরণ করা হয়েছে প্রখ্যাত ফরাসি নাবিক Jean-François de Galaup, Comte de Lapérouse এর নামে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ইতিহাসের সঙ্গেও এলাকাটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এটি বোটানি উপসাগর (Botany Bay) উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এখানেই রয়েছে ঐতিহাসিক Bare Island এবং তার ওপর নির্মিত Bare Island Fort। উনবিংশ শতাব্দীতে সম্ভাব্য নৌ-আক্রমণ থেকে বোটানি উপসাগর ও সিডনিকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে দুর্গটি নির্মাণ করা হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সামরিক প্রকৌশলী ঝরৎ চবঃবৎ ঝপৎধঃপযষবু-এর নকশায় এটি নির্মিত হয়। একটি সেতুর মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্বীপটির সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। দুর্গের চারপাশের স্বচ্ছ নীল জলে ডাইভিং ও স্নরকেলিংয়ের জন্যও স্থানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

Artwork

লাপেরুজের বেয়ার আইল্যান্ড ফোর্ট Lapérouse Bare Island Fort

পরদিন ড. বকসী আমাদের নিয়ে গেলেন নীল পর্বতমালায় । খুব সকালে যাত্রা শুরম্ন। পথে আমাদের সাথে যুক্ত হলো সুমনের পরিবার। শহর ছাড়িয়ে কিছু দূর এগোতেই চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, বিস্ত্মীর্ণ বনভূমি আর লক্ষ লক্ষ বৃক্ষের সমারোহ। প্রকৃতির নির্মলতা চোখে পড়ার মতো। আকাশ যেমন স্বচ্ছ, তেমনি পরিচ্ছন্ন চারপাশ। তবে এখানকার সবুজ বাংলাদেশের মতো গাঢ় নয়। আমাদের মান্দার, শিমুল কিংবা রক্তজবার দীপ্ত লাল এখানে অনুপস্থিত। যে কারণেই হয়তো বাংলাদেশের লাল-সবুজ প্রকৃতির প্রতি আমাদের এত গভীর টান; লাল-সবুজেই তো আমাদের প্রিয় জাতীয় পতাকা।


Blue Mountain এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় নিদর্শন থ্রি সিস্টার্স (Three Sisters)|। নিউ সাউথ ওয়েলসের এই তিনটি প্রাকৃতিক শিলাস্তম্ভ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে অপরূপ মহিমায়। সিডনি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শিলাস্তম্ভগুলোর উচ্চতা ৯০০ মিটারেরও বেশি। স্থানীয় আদিবাসী Gundungurra জনগোষ্ঠীর একটি জনপ্রিয় লোককাহিনির সঙ্গে এই তিন শিলাস্তম্ভের নাম জড়িয়ে আছে। তিনিটি স্তম্ভের নাগুলো হলো- গববযহর মিহনি (বড় বোন) ডরসষধয উইমলাহ (মেজবোন) এবং এঁহহবফড়ড় গান্নেডু (ছোটবোন)। এই তিন বোনকে যুদ্ধের বিপদ থেকে রক্ষা করতে এক জাদুকর তাদেরকে সাময়িকভাবে পাথরে পরিণত করে। কিন্তু পরে আর তাদেরকে মানুষে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। সেই থেকে তিন বোন পাথর হয়েই আছে। এ কাহিনী আমার কাছে একটি লোকগাথা বৈ অন্য কিছু মনে হয়নি। এটি ইতিহাসসমর্থিত কোনো ঘটনা নয়।


থ্রি সিস্টার্সের সৌন্দর্য কেবল তিনটি শিলাস্তম্ভেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মাথার ওপরে নীল আকাশ আর নিচে বিস্তৃত সবুজ উপত্যকা মিলিয়ে সৃষ্টি করেছে এক অপার্থিব দৃশ্য। পৃথিবীর নানা দেশে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে, বহু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও দেখেছি; কিন্তু থ্রি সিস্টার্স এর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। সবুজ বৃক্ষশোভিত উপত্যকার ওপর পড়া সূর্যালোকের প্রতিফলনে দূরের আকাশ নীলাভ আভায় ফুটে ওঠে। সম্ভবত

কাছেই রয়েছে মনোমুগ্ধকর Echo Point Lookout| এখান থেকে থ্রি সিস্টার্স ও জামিসন ভ্যালির (ঔধসরংড়হ ঠধষষবু) অপরূপ দৃশ্য একনজরে দেখা যায়। রয়েছে বিশ্বের অন্যতম খাড়া ঢালের রেলপথ ঝপবহরপ জধরষধিু, কেবলওয়ে ও স্কাইওয়ে—যেখান থেকে উপত্যকার সৌন্দর্য আরও বিস্তৃতভাবে উপভোগ করা যায়। কাছেই অবস্থিত বিশ্বের প্রাচীনতম উন্মুক্ত চুনাপাথরের গুহাগুলোর অন্যতম Jenolan Caves। সব মিলিয়ে স্থানটি আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ ও পরিতৃপ্ত করেছে।

কাটুম্বায় বিকেল চারটার আগে পৌঁছাতে পারলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি ঞবধ চড়ঃ গঁংবঁস দেখার সুযোগ মিলত। সেখানে বিশ্বের নানা দেশের হাজারো চায়ের পাত্র ও চায়ের পেয়ালার সংগ্রহ রয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য মাত্র পাঁচ ডলারে চা কিংবা কফি পান করার ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু সময়ের অভাবে সেই জাদুঘরটি আর দেখা হয়ে ওঠেনি।

দেখতে দেখতে দিন ফুরিয়ে এলো। এবার দেশে ফেরার পালা। সিদ্ধার্থ ১ জানুয়ারির ২০২৩ ফেরার বিমান টিকিট কেটেছিল। তার পরিকল্পনা ছিল, ৩১ ডিসেম্বর রাতে সিডনির বিশ্বখ্যাত নববর্ষের ফায়ারওয়ার্কস উপভোগ করে সোজা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হব।

সিডনিতে সেই ছিল আমার জীবনের প্রথম নববর্ষের ফায়ারওয়ার্কস দেখা। দ্বিতীয়বার সেই অভিজ্ঞতা হয় ২০২৫ সালের ৪ জুলাই নিউইয়র্কে। দিনটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন তেরোটি উপনিবেশ ব্রিটিশ রাজমুকুটের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। সেই ঐতিহাসিক Declaration of Independence-B পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। ঘোষণাপত্রটি কয়েকটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমত, সমতা (ঊয়ঁধষরঃু)—সব মানুষ জন্মগতভাবে সমান মর্যাদা ও অধিকারের অধিকারী। দ্বিতীয়ত, অবিচ্ছেদ্য অধিকার জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখ অন্বেষণের অধিকার মানুষের জন্মগত; কোনো রাষ্ট্র বা শাসক তা কেড়ে নিতে পারে না। তৃতীয়ত, জনগণের সম্মতিতে সরকার রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনগণ, তাই জনগণের সম্মতিতেই সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। চতুর্থত, সরকারের উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা। আর যদি কোনো সরকার সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় কিংবা জনগণের অধিকার হরণ করে, তবে জনগণের সেই সরকার পরিবর্তনের নৈতিক অধিকার রয়েছে। এই তেরোটি উপনিবেশের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে আরও ৩৭টি অঙ্গরাজ্য যুক্ত হয়ে আজকের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের যুক্তরাষ্ট্র গড়ে ওঠে। আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশটি তার রাজনৈতিক ঐক্য অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

Artwork ১৭৭৬ সালেরজুলাই ঐতিহাসিক মানচিত্র।Declaration of Independence এ স্বাক্ষরকারী তেরটি রাষ্ট্রের মানচিত্র

বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এবং সমালোচনা কম নয়। তবু অভিবাসীদের কাছে দেশটি এখনো অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। গত আড়াই শতাব্দীতে পৃথিবীর মানচিত্রে বহু রাষ্ট্রের উত্থান-পতন ঘটেছে, বহু সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, আবার নতুন নতুন রাষ্ট্রেরও জন্ম হয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩। এত পরিবর্তনের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। আমার বিশ্বাস, এই স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি নিহিত রয়েছে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ঘোষিত Declaration of Independence এর সেই চিরন্তন আদর্শগুলোর মধ্যেই।

রাত বারোটার ঘণ্টা বাজতেই শুরু হলো আলোর মহোৎসব। হারবার ব্রিজ ও অপেরা হাউসের গায়ে রঙিন আলোর অপূর্ব কারুকাজ, আর চারদিকে সমবেত মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হলো এক স্বপ্নময় পরিবেশ। কখন যে প্রায় তিন ঘণ্টা কেটে গেল, টেরই পাইনি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের আলিঙ্গন, নৃত্য আর নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার আনন্দে পুরো এলাকা মুখর হয়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে জনকলরব স্তিমিত হলে আমরাও বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

Artwork

রাতের আঁধার ভেদে আলোকিত অপেরা হাউসের সামনে আনন্দমূখর পরিবেশ


সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নিরাপত্তা তল্লাশির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। পেছনে দাঁড়িয়ে একমাত্র সন্তানের বিষণ্ন মুখ, আর তাকে ছেড়ে যাওয়ার বেদনায় মায়ের সজল চোখ। বিদায়ের সেই মুহূর্তে স্মৃতি, ভালোবাসা আর পুনর্মিলনের প্রত্যাশা একাকার হয়ে যাচ্ছিল। চোখের সামনে তখনও ভেসে উঠছিল তাসমান সাগরের তীরে অপেরা হাউসের গায়ে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য আলোর রেখা যেন সিডনি শহর তার অপার সৌন্দর্যের শেষ স্বাক্ষরটি আমাদের হৃদয়ে এঁকে দিয়ে বিদায় জানাচ্ছে।

Share on social media