A BILINGUAL ONLINE LITERARY MAGAZINE

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়: দ্রোহের কবি সুকান্ত

Summary:

A Poet of Rebellion and the Dreamer of Human Liberation: Sukanta Bhattacharya

Some people appear like meteorsbriefly illuminating their time, yet leaving a lasting impact. Sukanta Bhattacharya was one such poet. In a life of barely twenty-one years, he became a powerful voice against injustice, exploitation, hunger, deprivation, and inequality in Bengali poetry.

Raised in an extended, culturally enriched family, Sukanta was introduced to literature and the arts from an early age. Listening to Rabindranath Tagore’s songs in the arms of his elder sister, Rani Bhattacharya, helped nurture his literary and humanistic consciousness. The Second World War, the devastating Bengal Famine of 1943, and the realities of colonial exploitation later profoundly shaped his poetic vision.

His poems give voice to the hungry and oppressed, portray the struggles of working people, and express his dream of a society free from exploitation. Even while suffering from tuberculosis, Sukanta never stopped writing. He died on 13 May 1947, at just twenty-one. Yet death could not silence his voice. His poetry continues to inspire the struggle against injustice and inequality.

Sukanta was not merely a poet of rebellionhe was a poet of human liberation, equality, and the dream of a just and beautiful world.

রবীন্দ্র সংগীতের সুর থেকে বিপ্লবের শপথএক অগ্নিযুগের কবির জীবন ও সাহিত্য


১৯২৬ সালের ১৬ আগষ্ট (৩০ শ্রবণ ১৩৩৩) ৪২ মহিম হালদার স্ট্রীট, কালিঘাট, কলকাতাস্থ মাতামহ সতীশচন্দ্র ভট্টাচার্যের ছোট একটা বাড়িতে সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্ম গ্রহণ করেন। সুকান্ত বাবা নিবারণ চন্দ্র ভট্টাচার্য ও মা সুনীতি দেবির দ্বিতীয় সন্তান। ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায় ছিল সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের পূর্ব পুরুষদের আদিনিবাস,পরবর্তী কয়েক পুরুষ বাস করেন মাদারীপুরে।


মাত্র একুশ বছরের জীবনে একটি যুগের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠা এমন কবি বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিরল। সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৬ আগস্ট ১৯২৬১৩ মে ১৯৪৭) সেই ব্যতিক্রমী বিরল। ভাবতে ও বুঝতে শেখার পর থেকেই শোষণ, বঞ্চনা আর ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ তাঁকে দারুণ ভাবে নাড়া দেয়। তাই তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে শোষণ,বঞ্চনার বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহ।শোষণ মুক্ত সমাজ নির্মাণের অদম্য স্বপ্ন তার কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর কবিতায় যে প্রেম ও রোমান্টিকতা ফুটে উঠে তা মানুষের জন্য; তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে ন্যায়ভিত্তিক সাম্যের পৃথিবী গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়।


সুকান্তদের একান্নবর্তী পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও সাংস্কৃতিক আবহ ছিল সমৃদ্ধ। এই পরিবেশই তাঁর মনোজগত গঠনে গভীর ভূমিকা রাখে। সুকান্তের প্রাক শৈশব ছিল জ্যাঠতুতো বড় বোন রাণী’র স্নেহধন্য। এই রাণীদিই সেকালের খ্যাতনামা লেখক(রমলা-প্রণেতা) মণীন্দ্রলাল বসুর লেখা নিজের একটা প্রিয় গল্প-’সুকান্ত’র নায়কের নামানুসারেই ছোট ভাইটির নাম রেখেছিলেন। রাণী ভট্টাচার্য (রাণী’দি) ছোট্ট সুকান্তকে কোলে নিয়ে হাটতেন আর গুনগুন করে রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন, কখনো কখনো সুন্দর সুন্দর ছড়া, কবিতাও শুনাতেন সুকান্ত কে। রবীন্দ্রনাথের ছড়া কবিতাগুলো দারুণভাবে আকর্ষণ করত তাঁকে। রাণী’দি’র গুনগুন করে গাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীত, কবিতা, ছড়া শুনে শুনেই সুকান্ত প্রথম মানবতাবাদ, সৌন্দর্যবোধ ও মুক্তচিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন। মানুষের প্রতি অন্যায়, অবিচার, শোষন, বঞ্চনা আর নিপীড়নের অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে দ্রোহ সঞ্চারিত করে। এতে তাঁর কবিতার ভাব ও ভাষায় মানুষের প্রতি ভালবাসা ও দ্রোহ ই প্রাধান্য পায়। কবিতায় প্রকাশ ভিন্নতা সত্যেও রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রাথমিক আকর্ষণ তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে থাকে। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় তিনি তাই উল্লেখও করেছেন,


এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,

প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি,

এখনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি,

নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ ভ্রুকুটি।

এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে

তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে।


রাণী'র কন্ঠে শোনা রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা ছড়াগুলির মাধ্যমেয়ই ভবিষ্যতের দ্রোহের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের সাথে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের এক আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠে। যার ভিত্তি শ্রদ্ধার আর প্রবাহ অনুপ্রেরণার।


আগেই উল্লেখ করেছি সুকান্ত বেড়ে উঠেছন একটি সুন্দর পারিবারিক সাংস্কৃতিক বলয়ে। সুকান্তের জেঠা মশাই কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন সংস্কৃতে সুপণ্ডিত ও নিষ্ঠাবান সাহিত্যসেবী। বহু জ্ঞানী গুণী মানুষের পদচারণায় তাঁর সাহিত্যের আড্ডা আলোকিত হতো। বহু নবীন,তরুণ প্রাণের সমন্বয়ে জ্যাঠতুতো দাদা রাখাল ভট্টাচার্য একটা সাহিত্য চক্র গড়ে তোলেন, সুকান্তও এটির সাথে যুক্ত ছিলেন। শৈশবে রাণী'দির কোলে সুকান্তের মনে সাহিত্যের যে বীজ প্রোথিত হয়ে ছিল, ‘সাহিত্য চক্রের’ জমজমাট পরিবেশে সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে উঠে।


তাঁদের একান্নবর্তী পরিবারের উন্নত সাংস্কৃতিক পরিবেশে আনন্দ ও শান্তির ধারা অব্যাহত থাকেনি। একটি বড় আঘাতের পর এই ধারা ব্যহত হয়। সুকান্তের বয়স যখন সাত/আট বছর তখন হটাৎ তাঁর রাণী’দির মৃত্যু হয়। রাণী’র বাবা রাণী’র মৃত্যু হওয়া বাড়ীতে আর থাকতে না চাওয়ায় পরিবারটি দুই জায়গায় বিভক্ত হয়ে পরে। এতে সুকান্তের মর্মবেদনা তীব্রতর হয়ে উঠে।

সুকান্তের অক্ষর পরিচয় হয় বৈমাত্রেয় বোন সরযূ দেবীর কাছে। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় বেলঘাটার কমলা বিদ্যামন্দিরে। শৈশব থেকেই তাঁর পাঠ ও পাঠ বহির্ভূত জ্ঞান অর্জনে ছিল বিশেষ আগ্রহ।


রাণীদির মৃত্যুর আগে থেকেই সুকান্ত লেখালেখি করলেও এটি প্রথম নজরে আসে ১৯৩৫ সালে। সেবছর সুকান্তদের পরিবার হাওয়া বদলে সাওতাল পরগণার জডিসিতে বেড়াতে যায়। এখানেই সুকান্তের দাদা মনোজ ভট্টাচার্য বিস্ময়ের সাথ আবিষ্কার করেন এক সদ্য কিশোরের লেখায় শব্দ চয়ন ও ছন্দে দক্ষ এক কবি প্রতিভার ছাপ :


রমা রাণী দুই বোন, পরীর মতন

সবে বলে মেয়ে দুটি লক্ষী কেমন।

দুই বোন রমা রাণী –

সবে করে কানাকানি,

দুই বোন হবে ভালো,

করিবে যে ঘর আলো,

সীতার মতন।।

এই ছড়াটি জেঠতুত বোন রাণীদি ও মামাতো বোন রমাকে নিয়ে লেখা।


সুকান্তের সাহিত্য চর্চা শুরু হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি থেকেই। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় সুকান্ত 'সঞ্চয়' নামে হাতে লেখা একটা পত্রিকা বের করেন, এতে নিজের লেখা একটা হাসির গল্পও ছিল। একই শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি স্কুলের একটা অনুষ্ঠানে 'ধ্রুব' নাটকের নাম ভুমিকায় অভিনয়ও করেন। পঞ্চম শ্রেণীতে পাঠ কালেই তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বই ছাড়াও নানাধরণের বই পড়তেন; এমনকি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীও তিনি তখনই পড়ে ফেলেন।


রাণীদির মৃত্যু শোক ভুলতে না ভুলতেই তিনি মুখোমুখি হন আরেক কঠিন বাস্তবতার, তিনি হারান তাঁর মা সুনীতা দেবীকে। ১৯৩৭ সালে তখন তিনি ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে দূরে জেঠাইমার কাছে থেকে ছাত্র বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সুকান্তের মা সুনীতি দেবী ছিলেন স্নেহময়ী, দৃঢ়চেতা ও সংগ্রামী। সংসারের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধ, আত্মসম্মান ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছিলেন। সুকান্তের ব্যক্তিত্বে সেই শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট। এমন একজন মা ও রাণীদির মত প্রিয় আশ্রয় মাত্র এগার বছর বয়সের মধ্যেই পরপর হারিয়ে সুকান্ত হৃদয় বিষাদ ও শূন্যতায় আক্রান্ত হয়ে পরে। এই সময় দ্রুতই সুকান্ত মানসে ব্যপক পরিবর্তন আসে, বেড়ে যায় লেখালেখি। সুকান্তের বঁধানো খাতা ভরে উঠে গদ্যে-পদ্যে।


প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে সুকান্ত সাহিত্য চর্চার অনুকুল পরিবেশ পেয়ে যান, বেলঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে তিনি বন্ধু ও সহপাঠী হিসেবে পান অরুনাচল বসুকে। অরুনাচল বসু এবং তাঁর মা স্কুল শিক্ষিকা ও সুলেখিকা সরলা বসু দুজনেই ছিলেন সাহিত্যামোদী। সরলা বসুর স্নেহ-সাহচার্যে নিজ বাড়ির মমতার পরিবেশের অভাবও অনেকখানি পুরন হয়েছিল। স্কুল ও অরুনাচল বসুর বাড়ি দুজায়গায়ই সাহিত্য চর্চার পরিবেশ পেয়ে যান সুকান্ত। অরুনাচলের সহযোগিতা এবং সাহিত্যানুরাগী শিক্ষক নবদ্বীপচন্দ্র দেবনাথের তত্বাবধানে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রদের ছবি ও লেখা নিয়ে 'সপ্তমিকা' নামে হাতে লেখা পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পান সুকান্ত। সুকান্তের সাহিত্য প্রতিভায় মুগ্ধ অরুনাচল ও শিক্ষক নবদ্বীপ চন্দ্র দেবনাথ নানাভাবে সুকান্তের সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। তাঁর অতিরিক্ত পাওয়া বৈমাত্রেয় বড়ভাই সংস্কৃতিমনস্ক মনমোহন ভট্টাচার্যের বাড়ীর রুচিশীল ও পরিশীলিত পরিবেশ, যা সুকান্তকে দারুণ ভাবে আকর্ষণ করত। এই দাদার সহযোগিতায় ছাত্রাবস্থায়ই সুকান্তের কবিতা ”শিখা” পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। তখনই রেডিওতে গল্প-দাদুর আসরে সুকান্ত রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে শুনিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের প্রয়ান উপলক্ষে নিজের লেখা কবিতাও পড়েছেন। এভাবেই সুকান্তের সাহিত্য প্রতিভা ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে।


বৈশ্বিকভাবে বিশেষ করে ভারতবর্ষে তখকার সময়টা ছিল ভিন্নতর। একদিকে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের লড়াই অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আতঙ্কজনক বিভীষিকাময় পরিবেশ কিশোর কবিমানসে যন্ত্রণা, নৈরাশ্য ও সংশয়ের ছায়া ফেলেছিল যা তার সেই সময়কার লেখায় ফুটে উঠেছে।


১৯৪১ সালে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসী শক্তির অগ্রাভিযান নাগরিক জীবনে প্রচন্ড যুদ্ধ আতংক ছড়িয়ে পরে। দলে দলে মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুজতে থাকে। ১৯৪২ সালে কলকাতায় জাপানি বিমানের বোমাবর্ষণ পরিস্থিতি নাজুক করে তুলে। মানুষের জীবন একদম বিপর্যস্ত হয়ে পরে। মানুষের জীবনের সঙ্কট, শোষণ, বঞ্চনা, যুদ্ধ বিগ্রহের নিষ্ঠুর কষাঘাত সুকান্তকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দেয়। সেই সময়ের বৈশিষ্ট্যও ছিল শ্রেণী সংগ্রামের তীব্রতা ও উচ্চতর পর্যায়ে উত্তরণ প্রচেষ্টার। এই বৈশিষ্ট্য সুকান্তকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে। যার প্রভাব তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে দৃশ্যমান। সেই সময়কার সমসাময়িক রাজনীতিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রাবল্যর মধ্যেও কৃষক শ্রমিকদের লড়াই সংগ্রামের একটা ধরাও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছিল। কৃষক শ্রমিকেরা কৃষকসভা ও ট্রেড ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে সংগঠিত হচ্ছিল। শ্রেণী সংগ্রামের আবহে কৃষক শ্রমিক উদ্বেলিত হয়ে উঠে। এই উচ্ছ্বাস সুকান্তকে আলোড়িত ও এর সাথে সম্পৃক্ত করে তুলে। সুকান্তের লেখনী থেকে উদ্দীপ্ত করার মত অসাধারণ কবিতা নিঃসৃত হতে থাকে। প্রায় সব কবিতাতেই অধিকার আদায়ের দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত হচ্ছিল। এই সময়ে রচিত ‘পূর্বাভাস’ বিপ্লবী চেতনার দিক থেকে এক অসাধারণ গ্রন্থ। অধিকার আদায়ের দৃঢ়প্রত্যয় ব্যাক্ত করা কবিতাগুলোর মধ্যে ‘দুর্মর' অনন্য সাধারণ। কবি এখানে মানুষের জাগরণকে ‘সচেতনতার ধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন –


হিমালয় থেকে সুন্দরবন,হঠাৎ বাংলাদেশ

কেঁপে কেঁপে উঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,

সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ।

জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ আসে।

হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন

জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,

গত আকালের মৃত্যুকে মুছে

আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ।


কৈশোরেই তিনি প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শে আকৃষ্ট হন। সুকান্তের মধ্যে শ্রেণী চেতনা ও শ্রণী সংগ্রাম নিয়ে কোন অস্পষ্টতা ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা তাঁর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক চেতনাকে আরও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর কাছে কবিতা ছিল সমাজ পরিবর্তনের অস্ত্র।


সুকান্তের কাব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য তাঁর দ্রোহ। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় তিনি ব্যক্তিগত জীবনকে বৃহত্তর মানবমুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে একাকার করে দেন।


চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,


এখানেপৃথিবীর জঞ্জাল সরিয়ে নতুন পৃথিবী নির্মাণে কবির সংকল্প ব্যক্ত হয়েছে । এই ‘জঞ্জাল’ আসলে শোষণ, বৈষম্য, সাম্রাজ্যবাদ ও অমানবিকতার প্রতীক। কবির কাছে মৃত্যু ভয়ের নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই বড়। শোষণ, বঞ্চনা, ক্ষুধা, দারিদ্র ও মানুষের সামগ্রিক দুরবস্থা তাঁকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দেয় এবং বিদ্রোহী করে তুলে। ‘হে মহাজীবন’ কবিতায় তা প্রতিফলিত হয়েছে।


“প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা –

কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় :

পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।।”


বাংলা সাহিত্যের এমন শক্তিশালী সামাজিক রূপক খুব কমই ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে চাঁদের সৌন্দর্যের কোনো মূল্য নেই; তার কাছে সবচেয়ে বড় সত্য এক টুকরো রুটি। এই দুই পঙ্ক্তিতেই শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে দ্রোহের কবি সুকান্তের অনুভূতি মূর্তমান। তিনি আমাদের দেখিয়েছেনক্ষুধার কাছে কাব্য, সৌন্দর্য, রোমান্টিকতা সবই ম্লান হয়ে যায়।


সুকান্তের কাব্যচেতনার আরেকটি কালজয়ী উজ্জ্বল নিদর্শন ‘রানার’। এই কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন ডাকবাহকগ্রামের পথ, কাদা, ঝড়, বর্ষা কিংবা অন্ধকার রাতের সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে যিনি মানুষের সুখ-দুঃখের সংবাদ বয়ে নিয়ে চলেন। কিন্তু কবির দৃষ্টি কেবল তাঁর পেশার দিকে নয়; তাঁর জীবনের দিকে। যে মানুষটি প্রতিদিন অন্যের চিঠি পৌঁছে দেয়, অন্যের আনন্দ ও বেদনার খবর বহন করে, সমাজ তার নিজের জীবনসংগ্রামের খবর রাখে না। এখানেই ‘রানার’ হয়ে ওঠে বঞ্চিত সমগ্র শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামে প্রতীক। সুকান্ত দেখিয়েছেন, সভ্যতার অগ্রগতির পেছনে যাঁদের শ্রম সবচেয়ে বেশি, স্বীকৃতি তাঁদের সবচেয়ে কম। রানারের নিরন্তর ছুটে চলা আসলে কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মাঝি, ডাকবাহকঅসংখ্য নীরব মানুষের অবিরাম জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এই কবিতায় কোনো স্লোগান নেই, কিন্তু আছে গভীর সামাজিক উপলব্ধি ও প্রতিবাদ। পাঠক উপলব্ধি করেন, সমাজের প্রকৃত নায়করা প্রায়ই ইতিহাসে উপেক্ষিতই থেকে যান।


‘হে বিশ্বকবি’ কবিতায় সুকান্ত রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেন না; বরং তাঁর যুগের বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বুঝিয়ে দেন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও শোষণের সময়ে কবিতাকেও মানুষের সংগ্রামের পাশে দাঁড়াতে হয়। এ কারণেই তাঁর কাব্যে সৌন্দর্যের সঙ্গে প্রতিবাদ, স্বপ্নের সঙ্গে সংগ্রাম পাশাপাশি চলেছে।


দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ বলে মনে হওয়া বস্তুকেও সুকান্ত অসাধারণ শিল্পরূপ দিয়েছেন। ‘সিগারেট’ কবিতায় তিনি একটি সিগারেটকে কেবল ধূমপানের উপকরণ হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবে। আবার ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতায় ক্ষুদ্র একটি কাঠির মধ্যে তিনি দেখেছেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সম্ভাবনা। ক্ষুদ্র হলেও একটি দেশলাই যেমন অন্ধকার দূর করতে পারে, তেমনি একজন সাধারণ মানুষও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জ্বলে উঠতে পারে। এই প্রতীকচিন্তা সুকান্তের কাব্যভাষাকে দিয়েছে স্বতন্ত্রতা।

‘বোধন’ কবিতায় কবির দ্রোহ আরও সুস্পষ্ট। এই কবিতায় তিনি শোষণের নগ্ন রূপ উন্মোচন করেন, একইভাবে তিনি নিছক ধর্মীয় আচারকে নয়, মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে চান। তাঁর আহ্বান বাহ্যিক পূজার নয়, অন্তরের জাগরণের। মানুষ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে, তবে কোনো উৎসবই অর্থবহ নয়এই ভাবনাই কবিতাটির অন্তর্নিহিত শক্তি।


অন্যদিকে ‘অভিযাত্রিক’ কবিতায় আমরা দেখি এক অবিচল অগ্রযাত্রার দর্শন। বাধা, বিপদ কিংবা পরাজয় কবিকে থামাতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করেন, ইতিহাসের চাকা শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যায় মানুষের হাত ধরেই এবং শেষ জয় হবে মানুষেরই। এই আশাবাদই সুকান্তকে অনেক সমসাময়িক কবির থেকে আলাদা করেছে। তাঁর কবিতায় হতাশা আছে, কিন্তু পরাজয় নেই; মৃত্যু আছে, কিন্তু আত্মসমর্পণ নেই।


সুকান্তের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথাও আসে। তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তাঁর কবিতার স্থায়িত্বের কারণ কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়। তাঁর কবিতা আজও পাঠককে স্পর্শ করে, কারণ তিনি মানুষের মৌলিক অধিকার, ক্ষুধা, মর্যাদা ও সাম্যের কথা বলেছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা কখনো পুরোনো হয় না।


মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই যক্ষ্মা তাঁকে আক্রমণ করে। তখন যক্ষ্মা ছিল প্রায় মরণব্যাধি। যক্ষ্মা খুব অল্প বয়সেই সুকান্তকে গ্রাস করে। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থেকেও তিনি কলম থামাননি। শারীরিক দুর্বলতা তাঁর মানসিক শক্তিকে পরাজিত করতে পারেনি, বরং শারীরিক দুর্বলতা যত বেড়েছে, তাঁর মানসিক দৃঢ়তা ততই যেন উজ্জ্বল হয়েছে। আরও দ্রুত লেখার তাগিদ জাগ্রত হয়েছে। হাসপাতালের শয্যায় শুয়েও তিনি ক্রমাগত লিখেছেন মানুষের মুক্তির কবিতা, দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থেকেও তিনি সৃষ্টিশীলতা থামিয়ে দেননি। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে শুয়েই তিনি দেখেছেন নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন, লিখেছেন মানুষের জয়ের গান। তাঁর শরীর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, কিন্তু তাঁর কাব্যিক শক্তি ক্ষীণ হয়নি।

১৯৪৭ সালের ১৩ মে,মাত্র একুশ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়নি।


আজও যখন সমাজে বৈষম্য, ক্ষুধা, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে মানুষ লড়াই করে, তখন সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা নতুন করে উচ্চারিত হয়। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের কবি নন; তিনি মানুষের মর্যাদা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের কবি। তাঁর অগ্নিময় কবিতার ভাষা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়কবিতা কেবল অনুভূতির নয়, পরিবর্তনের। তিনি উপমহাদেশে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অস্তগমন দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু যে স্বাধীনতার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা কেবল ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান নয়; ছিল ক্ষুধা, বৈষম্য ও শোষণমুক্ত একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আজও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি বলেই তাঁর কবিতা আজও নতুন প্রজন্মকে আলোড়িত করে। আমাদের ভূখন্ডেও ৫২ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর সকল গনতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামেও সুকান্তের কবিতা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এবং জোগাচ্ছে।


সমকালীন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুকান্তের অসাধারণ প্রতিভার কথা একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের অনেক সমালোচকের মতে, যদি তিনি দীর্ঘজীবী হতেন, তবে আধুনিক বাংলা কবিতার গতিপথ আরও সমৃদ্ধ হতো। কিন্তু সাহিত্য ইতিহাসে এমন অনেক কবি আছেন, যাঁদের অবদান তাঁদের আয়ুর চেয়ে অনেক দীর্ঘ। সুকান্ত সেই বিরল কবিদের একজন।

আজকের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গউভয় বাংলার সামাজিক বাস্তবতায় সুকান্তকে নতুন করে পাঠ করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে, অর্থনীতির প্রসার ঘটেছে, কিন্তু ক্ষুধা, বৈষম্য, বেকারত্ব, শ্রমের অবমূল্যায়ন এবং সামাজিক অন্যায় এখনো সম্পূর্ণ দূর হয়নি। তাই ‘হে মহাজীবন’-এর ক্ষুধার্ত মানুষ, ‘রানার’-এর শ্রমজীবী ডাকবাহক কিংবা ‘ছাড়পত্র’-এর নতুন পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।


সুকান্ত ভট্টাচার্য কেবল কমিউনিস্ট কবি নন, কেবল বিদ্রোহের কবিও নন; তিনি মানুষের কবি। তাঁর কবিতায় প্রতিবাদ আছে, কিন্তু ঘৃণা নেই; সংগ্রাম আছে, কিন্তু মানবতার প্রতি আস্থা হারিয়ে যায় না। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীকে বদলানোর শক্তি মানুষের মধ্যেই নিহিত।

রবীন্দ্রসংগীতের সুরে শৈশবের যে শিশুটি সাহিত্যজগতে প্রথম পা রেখেছিল, সেই শিশুই একদিন বাংলা কবিতাকে শিখিয়েছিলকবিতা কেবল সৌন্দর্যের অলংকার নয়, মানুষের মুক্তিরও ভাষা। তাই সুকান্ত ভট্টাচার্য আজও প্রাসঙ্গিক, আজও প্রয়োজনীয়। যতদিন পৃথিবীতে ক্ষুধা থাকবে, অন্যায় থাকবে, শোষণ থাকবেততদিন তাঁর কবিতা মুক্তিকামী মানুষকে প্রেরণা যোগাবে; নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে, তাদের হৃদয়ে জ্বালাবে প্রতিবাদ, মানবতা ও ন্যায়বোধের দীপশিখা।


তথ্য সূত্র

১) সুকান্ত সমগ্র

২) ড. মাহবুবুল হকে'র "তিনজন আধুনিক কবি"

৩) মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর'র ''সুকান্ত ভট্টাচার্য '

৪) মুহাম্মদ সালাউদ্দিন'র 'পৃথিবীর বিস্ময় কবি সুকান্ত'

Share on social media