মাস্ক
“এলাইয়া পড়ে কন্যার দীঘল মাথার কেশ, পিন্ধন হইতে খুলে কন্যার পুরুষের বেশ...” বীরাঙ্গনা সখিনা পুঁথিতে পাওয়া যায় এহেন বর্ণনা।
সখিনা বিবি মাস্ক বা মুখোশ পরে যুদ্ধে নেমেছিলেন সে গল্প ছড়িয়ে আছে মানুষের
মুখে মুখে। কেল্লাতাজপুরের মুঘল মসনদ্দার উমর খাঁর কন্যা সখিনা বিবির সাথে
শত্রু জঙ্গলবাড়ির ঈশা খাঁর দৌহিত্র ফিরোজ খাঁর মধ্যে গভীর প্রেম কাহিনিতে
পুরুষের বেশে সখিনা বিবি মুখোশ পরে স্বামীর জীবন রক্ষার্থে সেনাপতি সেজে তার বাহিনী নিয়ে নিজ পিতার সমর্থিত মোগল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে অবর্তীর্ণ হন।
মোগল বাহিনী যখন নিশ্চিত পরাজয় দেখতে পেল, তখন প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে
ফিরোজ খাঁর মোহরযুক্ত মিথ্যা তালাকনামা মুখোশধারী এই বীরের সামনে হাজির
করে। তালাক নামা দেখেই সখিনা বিবি মূর্ছিত অবস্থায় অশ্বপৃষ্ঠ থেকে পড়ে যান
এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। মুখোশ খুলে পড়লেই তার পরিচয় জানতে পারে
সকলে।
বীরাঙ্গনা রাজিয়া সুলতানার গল্পটাও একই রকম। তিনি মুখোশ পরে পুরুষের বেশ
ধরে যুদ্ধবিগ্রহ ও শাসনকার্য চালাতেন (১২০৫-১২৪০)। কিন্তু রাজ্য পুনরুদ্ধারে
ভাইয়ের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তিনি বেশ ভালোভাবেই চালিয়ে যাচ্ছিলেন; হেরে
গিয়ে পলায়নরত অবস্থায় তাকে তারই আশ্রয়দাতা যখন জানতে পারে তিনি রাজিয়া
সুলতানা, তখন তাকে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলা হয়।
ইতিহাসে মুখোশের নানাবিধ ব্যবহার নিয়ে অনেক চমকপ্রদ গল্প আছে। সোহরাব রুস্তম গল্পে দেখা যায় দুজনেই হাতে নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত। কেউ হার মানতে চায় না। এটা তো শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। তা-ই প্রমাণ হবে এই
যুদ্ধে। পরাজিত হওয়ার পরিণাম যে মৃত্যু, দুই যোদ্ধাই সেটা জানতেন, তাই একে
অপরকে পরাজিত না করা পর্যন্ত চললো সেই যুদ্ধ। উভয়েই ছিল মুখোশ পরা যাতে
কেউ কাউকে চিনতে না পারে। মুখোশ কেন?
সেটাই তো ছিল তখনকার দন্দ্বযুদ্ধের রীতিনীতি।
একসময় এক মুখোশধারী হার মানলো। জীবিত অবস্থায় নয়, যুদ্ধে খুন হওয়ার
পরই প্রমাণ হলো রুস্তমই বড়ো বীর, সে-ই সর্বশ্রেষ্ঠ। প্রমাণিত বীর রুস্তম তার
প্রতিপক্ষকে যুদ্ধে হারিয়ে মুন্ডুপাত করে বীরদর্পে পরাজিত যোদ্ধার মুখোশ খুলে
কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাঁরই সন্তান সোহরাব, যাকে সে এতদিন খুঁজে বেড়িয়েছে, এযে তারই মৃতদেহ। সোহরাব রুস্তম গল্পে পার্সিয়ান কবি ফেরদৌসির শাহনামার সে এক মর্মান্তিক গল্প।
সোহরাব বা রুস্তম বলে আদৌ কেউ ছিল কি না ইতিহাসবিদরা বলতে পারবেন,
তবে মাস্ক পরা যে মাঝেমধ্যে কত সর্বনাশা হতে পারে তা ফেরদৌসির এই গল্পে
অনুধাবন করা যায়।
তবু সে যুগে মাস্ক বা মুখোশ পরার রেওয়াজ ছিল ক্ষেত্রবিশেষে। বিশেষ করে বিচারকরা মাস্ক পরতেন খুব ন্যায্য কারণে।
আমার মনে হয়, এখনো সেই নিয়ম কার্যকরী থাকা প্রয়োজন ছিলো।
কিন্তু কোনো এক কারনে সকল মাস্কের সমাপ্তি হলে মাস্ক মিউজিয়ামে চলে গেল। শুধু খুনি, চোর-চোট্টা, ডাকাতরা মাস্ক পরার প্রয়োজন বোধ করতে লাগলো।
এটার ব্যবহার যখন কেবল একটা ভয়ানক রূপ নিলো, ঠিক তখনই সৃষ্টিকর্তা
করোনা নামে এক মৃত্যুঘাতী গজব নাজেল করে সার্বজনিন মাস্ক অপরিহার্য করে
দিলেন।
যুদ্ধের মাস্ক থেকে এই মাস্ক আলাদা। তবু করোনা যুদ্ধে এই মাস্ক অসহায়ত্বের মাঝে একমাত্র অস্ত্র, মোক্ষমও বটে। এই মাস্কে নাক, মুখ ঢাকা থাকলেও মানুষ চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা না।
এই মাস্কের প্রচলনে দেশের মানুষের মধ্যে স্বস্তি যেমন ছিল, অস্বস্তিও ছিল দৃশ্যমান।
কেনরে বাবা, আমাদের অপরাধটা কী? ভালোই তো ছিলাম। “হাতমে বিড়ি মুহমে পান” নিয়ে বেশ তো রাস্তাঘাটে পানের পিক আর অন্যের মুখের উপর বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে আমরা পুরুষ মানুষ জাতি মুক্ত হাওয়ায় বেশ তো স্বাধীনতা ভোগ করছিলাম। হঠাৎ একি উপদ্রপ?