বৃদ্ধাশ্রম
সকালের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ির পূর্বমুখী বারান্দায় কাটা ড্রামে লাগানো কাগজি লেবুর গাছটির শিশিরভেজা পাতায় ভোরের আলো নীরবে কাঁপছিল। দুটি সাদা ফুল থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল মৃদু সুবাস। কুসুম যত্নভরে গাছের গোড়ায় পানি দিচ্ছিলেন, যেন একটি গাছ নয়, সংসারেরই কোনো প্রিয় সদস্যকে আদর করছেন। ঠিক তখনই ভেতর থেকে শাহরিয়ার কামালের সস্নেহ ডাক ভেসে এল, "কুসুম, চা হলো?" কুসুম হেসে বললেন, "আজ এত ভোরে কেন?" কামালও হেসে উত্তর দিলেন, "দূরের সাইটে যেতে হবে।" তখন কেউ জানত না, জীবনের সবচেয়ে গভীর শোক অনেক সময় এমনই এক শান্ত, সাধারণ সকালের ভাঁজে নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকে।
প্রাতরাশ শেষে কামাল বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু কয়েক কদম এগিয়েই আবার ফিরে এলেন। যথারীতি লাঞ্চবক্স ফেলে গেছেন। কুসুম মুচকি হেসে দুপুরতে খাবারের ছোট্ট বাক্সটি এগিয়ে দিলেন। দুজনের চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ল বহু বছরের দাম্পত্যের সহজ, নির্মল আনন্দ। সেই হাসিটুকুই ছিল তাদের অজান্তে ভাগ করে নেওয়া শেষ দিককার সুখের মুহূর্তগুলোর একটি। মানুষ কখন যে কোনো দৃশ্যকে শেষবারের মতো দেখে ফেলে, তখন তা বুঝতে পারে না; পরে সেই সাধারণ মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে অসাধারণ স্মৃতিতে পরিণত হয়।
আজ কুসুম নেই, দুই বছর হয়ে গেছে। তবু একাত্তর বছরের শাহরিয়ার কামাল প্রায় প্রতিদিন সেই বারান্দায় এসে দাঁড়ান। কুসুম চলে যাবার পর বেশ কয়েক মাস নিস্তেজ হয়ে পড়ে থেকে কাগজি লেবুর গাছটি আবার নতুন পাতায় ভরে উঠেছে, ফুল ফুটেছে, ফল ধরেছে। প্রকৃতি নিজের নিয়মে ফিরে এসেছে, শুধু ফিরে আসেনি গাছটির সবচেয়ে যত্নশীল মানুষটি। সবাই কামালকে একজন সফল নির্মাণ উদ্যোক্তা হিসেবেই চেনে। কিন্তু খুব কম মানুষ জানে, তার প্রথম পরিচয় ছিল একজন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের নির্মিত সবচেয়ে শক্ত ইমারতও একদিন ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু একটি সত্যিকারের কবিতা কিংবা একটি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা মানুষের ভাঙা হৃদয়কে নীরবে জোড়া লাগিয়ে দিতে পারে। অথচ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাকেই শিখতে হলো, সব ভাঙন কবিতার পংক্তিতে জোড়া লাগে না।
দ্বিতীয় পর্ব
একদিন নিউ মার্কেটের একটি স্টেশনারি দোকানে বহু বছর পর স্কুলজীবনের বন্ধু মোহিতের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল কামালের। মুহূর্তেই দূরত্ব মুছে গেল। কাছের এক চায়ের দোকানে বসে স্মৃতিচারণার ফাঁকে কামাল জানালেন, শিক্ষকতা তাঁকে মানসিক তৃপ্তি দিলেও সীমিত আয়ে পিতৃহীন সংসার, বৃদ্ধ মা ও ছোট দুই ভাইয়ের দায়িত্ব বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি নির্মাণকাজের সাব-কন্ট্রাকটর মোহিত বললেন, “তুই এতদিন মানুষ গড়েছিস, এবার ইট-পাথর দিয়ে ইমারত গড়। কাজ আমি আনব, তুই শুধু মানটা ধরে রেখে কাজ উঠাবি।”
বন্ধুর উৎসাহ আর পরিবারের দায়বদ্ধতায় কামাল শিক্ষকতা ছেড়ে মোহিতের সাথে নির্মাণ ব্যবসায় নামলেন। প্রতিষ্ঠানের নাম রাখলেন সাসটেইনেবল কন্সট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এসসিডি)। তার দৃঢ় ঘোষণা ছিল, “আমাদের নির্মিত ইমারত শুধু দাঁড়াবে না, টিকে থাকবে। মানুষের বিশ্বাসও তাই।”
শুরুটা ছিল ছোট ছোট কাজ দিয়ে। পুরোনো ভবন সংস্কার, কালভার্ট, রাস্তার কার্পেটিং, বাস স্টপেজ, যাত্রী ছাউনি নির্মাণ। মোহিত কাজ আনতেন, আর কামাল নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতায় সময়মতো কাজ শেষ করতেন। অল্প সময়েই এসসিডি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের আস্থা অর্জন করল।
কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে দুই বন্ধুর আদর্শগত দূরত্বও বাড়তে লাগল। দ্রুত লাভের আশায় মোহিত নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, পরিমাপে কম দেওয়া ও ভুয়া বিলকে ব্যবসার কৌশল মনে করতেন। একদিন সরকারি একটি ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের আগে তিনি নিম্নমানের রড ও সিমেন্ট এনে বললেন, “টেস্ট রিপোর্ট ঠিক করিয়ে আনব। পরিমাণে কিছু কম ব্যবহার করলেও কেউ ধরতে পারবে না।” কামাল শান্ত কণ্ঠে বললেন, “ভবন ভাঙলে কাগজ নয়, মানুষের হাড় ভাঙবে। মানুষও মারা যেতে পারে। সেই লাভ আমার দরকার নেই।” বিরক্ত হয়ে মোহিত বললেন, “তুই এখনো মাস্টারই রয়ে গেছিস।” কামালের জবাব ছিল, “মাস্টার হওয়া লজ্জার নয়, অসৎ ব্যবসায়ী হওয়া লজ্জার।”
মতের অমিল ক্রমেই গভীর হলো। চার বছর পর দুজন আলাদা হয়ে গেলেন। প্রতিষ্ঠানের নাম ও সুনাম নিজের কাছে রাখতে কামাল মোহিতকে পাওনার চেয়ে দশ শতাংশ বেশি অর্থ দিয়ে বিদায় জানালেন। চলে যাবার সময় মোহিত বলেছিলেন, “আদর্শ দিয়ে ব্যবসা চলে না রে।” কামাল শুধু বলেছিলেন, “আদর্শ হারিয়ে ব্যবসা চালাতে চাই না।
একক মালিক হওয়ার পর কামাল আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি ভবন নির্মাণে তিনি মাননিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেন। প্রয়োজন হলে নিজেই ভাইব্রেটর হাতে কংক্রিট কম্প্যাক্ট করতেন, নিজের হাতে স্লাম্প টেস্ট করতেন। একদিন ড্রাইভার অসুস্থ হলে নিজেই ট্রাক চালিয়ে মালামাল সাইটে পৌঁছে দিয়ে কাস্টিং পিছোতে দেননি। শ্রমিকদের সঙ্গে একই মাটিতে বসে খেতে তার কোনো সংকোচ ছিল না। হেডমিস্ত্রির প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “একটা ভবনের শক্তি তার ভিতে, মানুষেরও তাই। শক্ত ভিত্তি গড়তে হলে মাটির কাছেই থাকতে হয়।” নির্ধারিত সময়ের আগেই ল্যাবরেটরি ভবনের কাজ শেষ হলো। নির্মাণের মান দেখে নিয়োগকারী সংস্থার প্রকৌশলীরা বিস্মিত ও আনন্দিত হলেন।
সেদিন সাইট থেকে অফিসে না গিয়ে সরাসরি বাসায় ফিরে এসে শেক্সপিয়রের হ্যামলেট নাটকের একটি বাক্যে তার চোখ আটকে গিয়েছিল: To thine own self be true - নিজের কাছে সত্য থেকো। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কেমন যেন কোন অদৃশ্য শক্তির বলে একের পর এক ভবন, সেতু, রাস্তা, সরকারি ও বেরসরকারি প্রকল্পের কাজ আসতে থাকলো। এসসিডি-এর উপর কাজদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সাথে মানুষের আস্থাও বাড়তে থাকলো । এইভাবে দিনে দিনে এসসিডি’র প্রতিবছর এনুয়াল কন্সট্রাকশন টার্নওভার বৃদ্ধির সাথে সাথে নেট ওয়ার্থ বেড়ে যেতে লাগলো। তিনি ভাবলেন, এতোগুলো টাকা ব্যাঙ্কে রেখে শুধু সুদ জমানোর লাভ কী? প্রথমে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে একটি সুপারস্টোর করলেন। এর বছরখানেকের মধ্যে একটি কফি হাউজ প্রতিষ্ঠা করলেন। নিয়োগের পর পর নতুন কর্মীদের তিনি একটি কথাই বলতেন, "ভুল হতে পারে। প্রতারণা নয়। লাভ কম হলে ক্ষতি নেই, রাতের ঘুম যেন নষ্ট না হয়।"
সাফল্যের ভিড়েও তার দিনের সবচেয়ে নিশ্চিন্ত মুহূর্ত ছিল সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। দক্ষিণের জানালার পাশে কুসুম চায়ের মগ হাতে অপেক্ষা করতেন। দিনের সমস্ত ক্লান্তি যেন সেই এক মগ চায়ের ধোঁয়ায় মিলিয়ে যেত। কামাল ভাবতেন, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় কোনো ভবন নয়, এই মানুষটি।
তৃতীয় পর্ব
………………
মানুষের সম্পর্কেও কখনো কখনো ইমারতের মতো অদৃশ্য চিড় তৈরি হয়। নির্মাতা শাহরিয়ার কামাল জানতেন, বড় ধসের শুরু হয় এমন এক সূক্ষ্ম ফাটল থেকে, যা প্রথমে চোখেই পড়ে না। যেমন একটি সূক্ষ্ম ফাটল ধীরে ধীরে সেতুর কাঠামো দুর্বল করে, তেমনি সংসারও একদিন নিঃশব্দে ভেঙে যেতে শুরু করে। মধ্যবয়সে এসে তিনি নিজের সংসারেও সেই অদৃশ্য ক্ষয়ের আভাস পেয়েছিলেন। কোনো দিন ভাবেননি, সেই ফাটলের নাম হবে তার একমাত্র সন্তান চঞ্চল। কিন্তু এই ছেলের জন্মের সময় আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। কুসুম বলেছিলেন, "দেখো, একেবারে তোমার চোখ।" কামাল মৃদু হেসে বলেছিলেন, "চোখ আমার হতে পারে, মানুষটা যেন তোমার মতো হয়।" সেই স্বপ্নই ছিল তাদের সবচেয়ে প্রিয় নির্মাণ।
চঞ্চল বড় হলো সীমাহীন আদরে। ছোটখাটো ভুল কুসুম সহজেই ক্ষমা করে দিতেন। কামাল শুধু বলতেন, "ভুলের দাম দেওয়া সহজ, ভুলের দায় শেখানো কঠিন।" কিন্তু ছেলের হাসির কাছে সেই কথাগুলো হারিয়ে যেত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে চঞ্চলের চাহিদাও বাড়তে লাগল। খেলনা থেকে মোবাইল, মোবাইল থেকে বিলাসিতা, দামি ফাস্টফুড। কুসুম চাইতেন সন্তানের কোনো অভাব না থাকুক, আর কামাল বুঝতেন, অভাব শুধু অর্থের নয়, সংযমেরও হয়।
গ্রাজুয়েশন শেষে কামাল ছেলেকে একদিন একটা বড় কাজের সাইটে নিয়ে গিয়ে নির্মাণ শ্রমিকদের দেখিয়ে বলেছিলেন, "এই মানুষগুলোই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।" কিন্তু রড, সিমেন্ট,ধুলো আর রোদের মধ্যে চঞ্চল নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে পেল না। কয়েক দিনের মধ্যেই তার আগ্রহ শেষ হয়ে গেল। পরে সে এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ব্যবসা করতে চাইল। কুসুমের অনুরোধে কামাল বনানীতে অফিস, আসবাব, কম্পিউটার, কর্মচারী, সবকিছুর ব্যবস্থা করলেন। কাগজি লেবুর গাছে নতুন কুঁড়ি দেখে কুসুম বললেন, "দেখো, নতুন শুরু।" কামাল নিঃশব্দে বললেন, "সব কুঁড়ি বা ফুলে কি ফল হয়?"
বছর কেটে গেল। কিন্তু ব্যবসার কপালে সাফল্যের আলো আর ফুটল না। বরং মাসের পর মাস জমতে থাকল অফিস ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া, পাঁচতারা হোটেল, দামি ঘড়ি, বিদেশ ভ্রমণ আর বিদেশি সুগন্ধির বিল। মাস শেষে ব্যাংকের হিসাবের খাতা খুলে কামাল অনেকক্ষণ নীরবে বসে থাকতেন। কুসুম এক মগ চা এগিয়ে দিয়ে আস্তে বলতেন, "চা যে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।" কামাল মৃদু হেসে উত্তর দিতেন, "চা ঠান্ডা হলে আবার গরম করা যায়। কিন্তু লক্ষ্য আর ইচ্ছাশক্তি একবার ঠান্ডা হয়ে গেলে?" কুসুমের আর কিছু বলার থাকত না।
এরই মধ্যে চঞ্চল জানাল, সে কণা নামের একটি মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। প্রথম দেখায় মেয়েটিকে সবারই ভালো লেগেছিল। পরিপাটি, ভদ্র, কথাবার্তায় সংযমী। তবে আলাপের ফাঁকে কামালের ব্যবসা, বাড়ির আয়তন আর গাড়ির মডেল নিয়ে তার অস্বাভাবিক কৌতূহল কামালের মনে এক অদ্ভুত প্রশ্নের রেখা এঁকে দিয়েছিল। কণা চলে গেলে তিনি শুধু বলেছিলেন, "মেয়েটি বেশ বুদ্ধিমতী।" কুসুম হেসে বলেছিলেন, "বুদ্ধিমতী মেয়েই তো সংসার সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে পারে।"
বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস বাড়িটা যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেল। কণা হাসিমুখে সবার খোঁজ নিত, কুসুমের কাছে রান্না শিখত, অতিথিদের আন্তরিকতায় আপ্যায়ন করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা আরেকটি মুখ ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে লাগল। পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। কুসুমও প্রথমে কিছু বুঝতে পারেননি। কণাকে তিনি মেয়ের মতোই বুকে টেনে নিয়েছিলেন। নিজের হাতে রান্না শিখিয়েছেন, আলমারির চাবি তুলে দিয়েছেন, সংসারের দায়িত্বও ভাগ করে দিয়েছেন। কামাল মজা করে বলতেন, "দেখছি, আমার চেয়ে কণাই বেশি আদর পাচ্ছে।" কুসুম হেসে বলতেন, "মেয়ে তো কখনও পাইনি।"
কিন্তু ধীরে ধীরে সংসারের সবকিছু যেন কণার হাতেই চলে গেল। কী রান্না হবে, বাজার থেকে কী আসবে, অতিথিদের কে আপ্যায়ন করবে, এমনকি কোন বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, শেষ কথাটা কণাই বলত। কুসুম পাশে থাকতেন, কিন্তু তার মতামত কেউ আর বিশেষ জানতে চাইত না।
একদিন বদলে গেল পর্দা, আরেকদিন আসবাবের বিন্যাস। তারপর অদৃশ্যভাবেই বদলে যেতে লাগল সংসারের ভারসাম্য। কী রান্না হবে, কে কখন আসবে, কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে, সবকিছুর শেষ কথাটি যেন কণারই হয়ে উঠল। তখন কুসুম বুঝলেন, দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া আর সংসারের কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেওয়া এক কথা নয়।
কামাল লক্ষ করতেন, কুসুম আর আগের মতো গল্প করেন না। সুযোগ পেলেই জানালার পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকেন। তিনি জিজ্ঞেস করলে কুসুম প্রতিবারই মৃদু হেসে বলতেন, "কিছু না।" চার দশকের দাম্পত্যে কামাল জানতেন, এই "কিছু না" কথাটির ভেতরেই সবচেয়ে বেশি না-বলা ব্যথা লুকিয়ে থাকে। তবু তিনি আর কিছু জানতে চাইতেন না। কারণ ভালোবাসারও এমন কিছু ভাষা আছে, যা নীরবতাতেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এক সন্ধ্যায় দুজনে পাশাপাশি বসেছিলেন বারান্দায়। মাঝখানে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এক মগ চা, সামনে কাগজি লেবুর গাছ। হালকা বাতাসে কয়েকটি হলুদ পাতা নিঃশব্দে মাটিতে ঝরে পড়ছিল। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল চঞ্চল আর কণার হাসির শব্দ। কুসুম আস্তে করে আঁচলটা গুছিয়ে নিলেন। কামাল সেই ছোট্ট ভঙ্গিটি দেখেছিলেন, কিন্তু তার বুকের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটি শুনতে পাননি। সংসারের সবচেয়ে গভীর অশান্তিগুলো অনেক সময় কোনো ঝড় তোলে না, কোনো শব্দও করে না; নিঃশব্দেই একদিন শেকড় গেড়ে বসে।
চতুর্থ পর্ব
একদিন কামাল ইলিশ মাছ খেতে চাইলেন। কুসুম রান্নাঘরের দিকে এগোতেই কণা বলল, "আজ ডায়েট মেনু করেছি।" রাতে কামাল জিজ্ঞেস করলেন, "ইলিশ রান্না হলো না?" কণা নির্বিকার গলায় বলল, "বাজারে ভালো মাছ পাইনি।" কুসুম চুপচাপ ভাত মেখে গেলেন। ফ্রিজে রাখা ইলিশটার কথা আর মুখে আনলেন না।
এর কিছুদিন পর বিয়ের প্রথম বছরে রপ্তানি মেলা থেকে কেনা তাদের প্রিয় বোনচায়নার দুটি চায়ের মগ আর খুঁজে পেলেন না। কণা হেসে বলল, "পুরোনো হয়ে গিয়েছিল, ফেলে দিয়েছি।" কুসুম শুধু অন্য কাপে চা ঢেলে বারান্দায় গিয়ে বসলেন। চায়ের স্বাদ একই ছিল, তবু বিকেলটা কেমন যেন ফাঁকা লাগছিল।
বারান্দার কাগজি লেবুর গাছে তখনও ফুল ফুটত। কিন্তু একটি ডাল ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছিল। কুসুম প্রতিদিন সেই ডালেও পানি দিতেন। হয়তো অভ্যাসে, হয়তো আশা ছাড়তে মন চাইত না।
অতিথিরা এলে কণা বলত, "আপনি বসুন, আমি দেখছি।" একদিন এক পুরোনো প্রতিবেশী অবাক হয়ে বললেন, "ভাবি, শুনলাম আপনি নাকি এখন আর কারও সঙ্গে দেখা করেন না!" কুসুম শুধু মৃদু হেসেছিলেন। উত্তর দেননি।
কামাল কিছুই বুঝতে পারতেন না। অফিস থেকে ফিরে দেখতেন, কণা হাসিমুখে খাবার দিচ্ছে, চঞ্চল গল্প করছে, আর কুসুম নিস্প্রভ হয়ে নীরবে পাশে বসে আছেন। মাঝে মাঝে কামাল জিজ্ঞেস করতেন, "কী হয়েছে?" কুসুম প্রতিবারই বলতেন, "কিছু না তো।"
একদিন প্রেসারের ওষুধ খুঁজে না পেয়ে কুসুম দিশেহারা হয়ে গেলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কাজের ছেলে রহিম রান্নাঘরের তেলচিটচিটে তাকে ওষুধের পাতাটা খুঁজে পেল। সেখানে কীভাবে গেল, কেউ বলতে পারল না। সেদিন সন্ধ্যায় কামাল তার ক্লান্ত মুখ দেখে ডাক্তার ডাকলেন। পরীক্ষা শেষে চিকিৎসক শুধু বললেন, "ওষুধ চলবে। তবে ওঁকে দুশ্চিন্তা থেকে যতটা পারেন দূরে রাখবেন।"
কয়েক দিন পর গাছে পানি দিতে গিয়ে কুসুমের মাথা ঘুরে গেল। হাতে ধরা ছোট ঝাঁঝরিটা মেঝেতে পড়ে গেল। ছুটা বুয়া জান্নাত দৌড়ে এসে তাকে ধরে ঘরে নিল। কণা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুধু বলল, "বিছানায় শুইয়ে দাও। দরকার হলে ডাক্তার ডাকবে।" তারপর নিজের ঘরে চলে গেল।
সেদিন রাতে কামাল কুসুমের হাত ধরে আস্তে করে বললেন, "তুমি কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছ?" কুসুম কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, "না গো, বয়স হয়েছে।" কামাল আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
পঞ্চম পর্ব
…………..
পৃথিবী যেন একদিন হঠাৎ থেমে গেল। অদৃশ্য এক ভাইরাস শহর থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ল। রাস্তাঘাট ফাঁকা, হাসপাতাল উপচে পড়ছে, মানুষের মুখ ঢেকে গেল মাস্কে। চারদিকে এমন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল, যেন বাতাসেও আতঙ্কের গন্ধ। শাহরিয়ার কামাল প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কাজ বন্ধ রাখলেন, কিন্তু কোনো কর্মচারীর বেতন বন্ধ হতে দিলেন না। তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্র হয়ে উঠলেন কুসুম। অতিথি আসা বন্ধ হলো। বাইরে থেকে কেউ ফিরলে দরজার কাছেই স্যানিটাইজার ব্যবহার করে জামাকাপড় বদলে তবেই ঘরে ঢোকার নিয়ম করলেন। কুসুমকে প্রায়ই বলতেন, "কারও সঙ্গে হাত মেলাবে না। কারও সর্দি-কাশি থাকলে মাস্ক ছাড়া সামনে আসতে দেবে না।" কুসুম হেসে বলতেন, "এত আগলে রাখছ, যেন আমাকে কাঁচের শোকেসে তুলে রাখবে।" কামালও হেসে বলতেন, "পারলে তাই রাখতাম।"
বারান্দার কাগজি লেবুর গাছটির একটি ডাল ততদিনে শুকিয়ে এসেছে। তবু কুসুম প্রতিদিন যত্ন করে পানি দিতেন। শুকনো পাতায় হাত বুলিয়ে আস্তে করে বলতেন, "আরেকটু চেষ্টা করো।" কথাটা গাছকে বলতেন, না নিজেকেই, তা কেউ বুঝতে পারত না।
কয়েক দিন পর কুসুমের জ্বর এলো। প্রথম দিন যেন কিছুই হয়নি, এমন ভান করে আগের মতোই চা বানালেন, রান্নাঘরে গেলেন, এমনকি গাছটিতেও পানি দিলেন। কিন্তু সন্ধ্যায় কপালে হাত রাখতেই কামালের বুক কেঁপে উঠল। পরদিন পরীক্ষার রিপোর্টে মাত্র একটি শব্দ ফুটে উঠল, "পজিটিভ"। ছোট্ট সেই শব্দটিই মুহূর্তে যেন পুরো বাড়ির রং বদলে দিল। চঞ্চল নিজের ঘরে সরে গেল। কণা ব্যস্ত হয়ে পড়ল আলাদা থাকা আর জীবাণুমুক্ত পরিবেশের ব্যবস্থা করতে। আর কামাল নীরবে চিকিৎসকের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে লাগলেন।
দিন যত গড়াল, কুসুমের জ্বর তত বাড়ল। কাশি গভীর হলো, শ্বাস নিতে কষ্ট শুরু হলো। অক্সিমিটারের সংখ্যাটা ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল। কামাল বারবার যন্ত্রটি খুলে আবার লাগাচ্ছিলেন, যেন এবার হয়তো সংখ্যাটা বদলে যাবে। কুসুম ম্লান হেসে বললেন, "যন্ত্রটাই বোধহয় খারাপ।" কামাল শুধু মুখ ফিরিয়ে নিলেন। নিজের চোখের জল লুকোনো ছাড়া তখন আর কিছুই করার ছিল না।
গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল। হুইলচেয়ারে বসে ঘর ছাড়ার আগে কুসুম একবার ডাইনিং রুমের কাটলারিজ, ফ্যামিলি লিভিং রুমের গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, ড্রয়িংরুমের দেয়ালের ছবিগুলো আর শেষে বারান্দার কাগজি লেবুর গাছটির দিকে তাকালেন। চোখ ভিজে উঠল। খুব আস্তে বললেন, "গাছটায় পানি দিয়ো।" কামাল শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। অ্যাম্বুলেন্সটি সাইরেন বাজিয়ে দূরে মিলিয়ে গেল। ঠিক তখনই ঘরের সবার অগোচরে কাগজি লেবুর গাছের শুকিয়ে যাওয়া ডালটি নিঃশব্দে ভেঙে মাটিতে পড়ে রইল।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল এক অদৃশ্য দেয়াল। ওপারে অক্সিজেন মাস্কে ঢাকা কুসুম, এপারে কামাল। কথা বলা গেল না, শুধু চোখে চোখ রেখে কত না-বলা কথা বলে ফেললেন দুজন। স্বয়ংক্রিয় দরজাটি বন্ধ হয়ে যেতেই কামালের মনে হলো, দরজার ওপাশে শুধু কুসুম নন, তাদের চল্লিশ বছরের সংসারটাও আটকে রইল।
প্রতিদিন হাসপাতালের করিডরে বসে অপেক্ষা করতেন তিনি। একদিন এক নার্স ভিডিও কলে কুসুমকে দেখার সুযোগ করে দিলেন। কামাল বললেন, "গাছটায় পানি দিয়েছি। নতুন কুঁড়িও এসেছে।" কথাটা সত্য ছিল না। তবু কুসুমের ক্লান্ত চোখে একফোঁটা আলো ফুটে উঠল। কামাল শুধু বললেন, "শিগগির ভালো হয়ে যাবে। তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।" সেটিই ছিল তাদের শেষ কথা।
পরের রাতে হাসপাতালের নম্বরটি মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠতেই কামাল সব বুঝে গেলেন। ওপাশ থেকে শুধু শোনা গেল, "আমরা দুঃখিত..." তারপর আর কোনো শব্দ তার কানে পৌঁছাল না। হাত থেকে পড়ে গেল কুসুমের জন্য আনা ব্যাগ। মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল একটি শাল, চশমার বাক্স আর রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের বই। করিডরে বসে প্রতিদিন সেই বই থেকে গল্প পড়তেন তিনি। ভেবেছিলেন, কুসুম সুস্থ হয়ে ফিরলে একদিন বেছে বেছে তাকে গল্প শোনাবেন। সেই ছোট্ট ইচ্ছেটুকুও সেদিন চুপচাপ ভেঙে গেল।
যে মানুষটির সঙ্গে চল্লিশটি বছর একই ছাদের নিচে, একই ঘরে, একই শয্যায় কাটিয়েছেন, তাকে সেদিন শববাহী গাড়ি চিরবিদায়ের পথে নিয়ে গেল। সংক্রমণের ভয়েই শেষবারের মতো কুসুমের মুখটুকুও ছুঁয়ে দেখতে পারলেন না কামাল। মানুষে মানুষে এমন নির্মম দূরত্বও যে একদিন মৃত্যু তৈরি করবে, ভাবতেই তিনি শিশুর মতো ভেঙে পড়ে কাঁদলেন।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে থেকে বারান্দায় এলেন। কাগজি লেবুর গাছটির গোড়ায় ধীরে ধীরে পানি ঢাললেন। পানি মাটিতে মিশে গেল, কিন্তু যে মানুষটি প্রতিদিন এই গাছটিকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখতেন, তাকে আর কোনো পানি, কোনো অপেক্ষা, কোনো ভালোবাসাই ফিরিয়ে আনতে পারল না।
শেষ পর্ব
…………..
কুসুম চলে যাওয়ার পর বাড়িটা যেন হঠাৎ করেই নিঃশব্দ হয়ে গেল। ফ্যামিলি লিভিং রুমের ঘড়ি আগের মতোই টিকটিক করে । বারান্দার কাগজি লেবুর গাছেও ফুল ফোটে, কিন্তু সন্ধ্যার চায়ের মগ আর কেউ এগিয়ে দেয় না। কামাল আজও অভ্যাসবশে দুটি কাপ বের করেন। তারপর একটু থেমে একটি আবার ডাইনিং শ্যোকেসে তুলে রাখেন। দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে গেল।
মানুষের চোখে তিনি এখনও সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু ভেতরের মানুষটি যেন প্রতিদিন একটু একটু করে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল। অফিসে যাওয়া কমে গেল। প্রয়োজনীয় নির্দেশ ফোনেই দিতেন। জরুরি কাগজপত্র অফিস থেকে বাসায় নিয়ে এলে হোম-অফিসে বসে নীরবে সই করে আবার ফিরিয়ে দিতেন।
এই সময় থেকেই পুত্র-পুত্রবধূর মুখোশটি ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল। চঞ্চল আর কণা বুঝে নিয়েছিল, বাবা আর আগের মতো কর্মক্ষম নন। সময়ের সঙ্গে তিনি যেন তাদের কাছে প্রয়োজনের মানুষ নয়, দায়িত্বের বোঝা হয়ে উঠছেন। কামালের সঙ্গে একটি কথাও না বলে কণা কুসুমের যত্নে জমানো বেশিরভাগ শাড়ি আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দিল। কুসুমের সযত্নে সাজানো ঘরের প্রিয় শোপিসগুলোও একে একে অদৃশ্য হতে লাগল। যে ঘরে একদিন কুসুমের স্পর্শ ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে নেমে এল এক অচেনা শূন্যতা। চঞ্চল আর কণার আচরণে কামাল বুঝতে পারলেন, তিনি যেন এই সংসারে রক্তমাংসের মানুষ নন, নিঃশব্দে পড়ে থাকা একটি আসবাবমাত্র।
এরই মধ্যে কয়েক দিনের জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে কামাল আরও একটি কঠিন সত্য উপলব্ধি করলেন। তার অসুস্থতার চেয়ে চঞ্চল আর কণার আগ্রহ যেন বেশি ব্যবসা, ব্যাংকের কাগজপত্র, জমির দলিল আর বাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেউ মুখ ফুটে কিছু বলত না, কিন্তু প্রতিটি কথার আড়ালে যেন একই প্রশ্ন ঘুরপাক খেত, আর কতদিন? এরপর সবকিছু কবে তাদের হবে, সংসার আর সম্পদের সব সিদ্ধান্তে কামালের উপস্থিতি কবে শুধুই অতীত হয়ে যাবে?
জ্বর প্রায় সেরে এসেছে। এক রাতে হোম-অফিস থেকে ওষুধ আনতে গিয়ে করিডরে হঠাৎ তার পা থেমে গেল। ভেতরের ঘর থেকে ভেসে এল চাপা স্বর। কণা বলছে, "এভাবে আর কতদিন?" চঞ্চল শান্ত গলায় উত্তর দিল, "বাবার ব্যবসাগুলো আমাদের নামে ট্রান্সফার হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।" কণা ফিসফিস করে বলল, "আগে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আমাদের নামে করিয়ে নিতে হবে। তারপর বৃদ্ধাশ্রমে দিলেই সব ঝামেলা শেষ।"
কথাগুলো খুব আস্তে বলা হয়েছিল, তবু প্রতিটি শব্দ কামালের বুকে তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো বিঁধল। তিনি দরজায় কড়া নাড়লেন না। নিঃশব্দে ফিরে এসে কুসুমের ছবির সামনে বসে রইলেন। অনেকক্ষণ। সেদিন রাতেই তিনি বুঝলেন, মানুষকে সবচেয়ে গভীরভাবে ভেঙে দেয় শত্রুর আঘাত নয়, আপনজনের নির্দয় আচরণ।
পরদিনই শাহরিয়ার কামাল বেশকিছুদিন পর অফিসে গেলেন। বহুদিনের বন্ধু ব্যারিস্টার আনিসকে অফিসে আমন্ত্রণ জানালেন। শান্ত গলায় বললেন, "আমার সম্পদে শুধু আমার শ্রম নেই, কুসুমের ভালোবাসাও আছে। তাই এর উত্তরাধিকার শুধু রক্তের সম্পর্কের হতে পারে না।" কয়েক দিনের মধ্যেই তৈরি হলো উইল। বাড়ি, ব্যাঙ্কের সঞ্চয় এবং তিনটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিয়ে গড়ে উঠল " কামাল-কুসুম ট্রাস্ট"। কামালের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যারিস্টার উইলে লিখলেন "আমার মৃত্যুর পর আমার সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি 'কামাল-কুসুম ট্রাস্ট'-এর নিকট অর্পিত হবে। এই ট্রাস্টের উদ্দেশ্য হবে অসহায় বৃদ্ধদের সেবা, দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা।"
এরপর একদিন ডেভেলপার বন্ধু হামিদুর রহমানের কাছে তাদের স্বপ্নের ডুপ্লেক্স বাড়িটি বিক্রি করে দিলেন। বিক্রির পুরো অর্থ জমা হবে ট্রাস্টের তহবিলে। শুধু একটি শর্ত, আর এক মাস পর বাড়ির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হবে। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য কামালের হাত কেঁপে উঠল। এই বাড়ির প্রতিটি ইটের সঙ্গে মিশে ছিল তার ঘাম, আর প্রতিটি দেয়ালে লেগে ছিল কুসুমের ভালোবাসার ছোঁয়া। এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল, গ্রিন সুপার মার্কেট, গুলশানের কত দোকান যে দুজনে ঘুরেছেন, শুধু এই বাড়িটাকে নিজের স্বপ্নের মতো সাজাবেন বলে। বাথরুমের ফিটিংস থেকে শুরু করে টাইলস, পর্দা, আলো, আসবাব, প্রতিটি জিনিসেই ছিল দুজনের পছন্দ, তর্ক, হাসি আর ভালোবাসার গল্প। আজ কলমের সামান্য কালিতে যেন সেই দীর্ঘ জীবনের স্মৃতিগুলোই নীরবে বিদায় নিল। তবু কামাল জানতেন, মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটিকেও ছেড়ে দিতে হয় আরও বড় এক সত্যের কাছে মাথা নত করে।
ঠিক এক মাস পর এক সকালে কামাল ব্যাংকে ফোন করে চঞ্চলের অতিরিক্ত ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা বাতিল করে দিলেন। পরদিন অনলাইনে সকালের নাশতার বিল পরিশোধ না হওয়ায় বিস্মিত চঞ্চল তড়িঘড়ি কামালের কাছে এসে বলল, "বাবা, কার্ডটা কাজ করছে না।" কামাল ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, "অফিসে গিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলব। এখন আমার একটু দেরি হয়ে যাচ্ছে।" তারপর আর একটি কথাও বললেন না। তার নীরবতাই যেন সেদিন সবচেয়ে কঠিন উত্তর হয়ে রইল।
অফিসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই একের পর এক ফোন আসতে লাগল। কামাল কোনো কলই ধরলেন না। শেষে একটি বার্তা খুললেন। সেখানে লেখা, "বাবা, কিছু লোক এসেছে। বলছে, আমাদের বাড়িটা না কি বিক্রি হয়ে গেছে। এক ঘণ্টার মধ্যে আমাদের বের হয়ে যেতে হবে। বাবা, এসব কী হচ্ছে?"
মোবাইল স্ক্রিনে মেসেজটি পড়ে তিনি অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলেন। চোখে কোনো বিজয়ের দীপ্তি ছিল না, ছিল শুধু এক গভীর, নিঃশব্দ ক্লান্তি। মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তে জিতে গিয়েও তিনি যেন সবকিছু হারিয়ে ফেলেছেন। ধীরে ধীরে ফোনটি বন্ধ করলেন। তারপর অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়িতে নয়, একটি উবারে উঠে অজানা কোনো গন্তব্যের দিকে হারিয়ে গেলেন।
বিকেলের দিকে চঞ্চল ছুটে এল বাবার অফিসে। চোখ দুটো কান্নায় লাল। একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে লাগল, "বাবা কোথায়?" কিন্তু কারও কাছে কোনো উত্তর ছিল না। ঠিক তখনই অচেনা একটি নম্বর থেকে ফোন এল।
"চঞ্চল..."
বাবার কণ্ঠ শুনেই সে ভেঙে পড়ল। "বাবা... আমি ভুল করেছি। আমি আর কণা এখনই তোমার কাছে আসছি। তুমি চাইলে আমাদের যত ইচ্ছে শাস্তি দাও, বকা দাও, কিন্তু একবার ফিরে এসো।"ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর ভেসে এল শান্ত, স্থির কণ্ঠ, "তোমরা তো মাসখানেক আগেই আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে।" চঞ্চলের কান্না আর থামল না। "বাবা... আমাকে ক্ষমা করে দাও।" কামাল ধীরে ধীরে বললেন, "ক্ষমা করতে পারি, চঞ্চল। কিন্তু বিশ্বাস যে কাঁচের মতো। একবার ভেঙে গেলে তা যে আর পুরোপুরি আগের মতো জোড়া লাগেনা।" আবারও কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর শেষবারের মতো বললেন, "আমি আছি দূরে কোথাও ঠিকানা বিহীন। আমাকে খুঁজো না। খুঁজলেও পাবে না।"
লাইনটি কেটে গেল। কিন্তু সেই নীরবতার প্রতিধ্বনি চঞ্চলের বুকের ভেতর আজীবনের জন্য থেকে গেল।
সন্ধ্যা নেমে আসছিল। ব্যস্ত শহরের মানুষের ভিড়ে একা দাঁড়িয়ে চঞ্চল প্রথমবার উপলব্ধি করল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো বাড়ি, ব্যবসা কিংবা ব্যাংকের অর্থ নয়। একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তার বাবার ভালোবাসা আর নিঃশর্ত বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে, পৃথিবীর সব অশ্রু, সব অনুতাপ, সব প্রার্থনাও তাকে আর আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে পারে না।
হয়তো কোনো এক বৃদ্ধাশ্রমের ছোট্ট ঘরে, কিংবা কোনো অচেনা শহরের নীরব বিকেলে, শাহরিয়ার কামাল এখনও বেঁচে আছেন। কিন্তু যে মানুষটি একদিন সংসারের জন্য নিজের সমস্ত জীবন উজাড় করে দিয়েছিলেন, তিনি আর কখনও ফিরে আসবেন না সেই ঘরে, যেখানে তার ভালোবাসার চেয়ে সম্পদের মূল্য বেশি হয়ে উঠেছিল।
----------০০০০০০০----------